ঢাকা,শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪

চকরিয়া সদরে ব্যক্তিগত কাঁচাবাজারের খাজনা যায় হক পরিবারের পকেটে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চকরিয়া :: কক্সবাজারের চকরিয়া সদরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা পৌরসভার চিরিংগা শহরের কাঁচাবাজার সড়ক। সেখানে প্রায় ১ একর জমিতে কাঁচা বাজার বসিয়েছে পৌরসভার প্রভাবশালী ‘হক সাহেব’ পরিবার। এই বাজারে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০-এর বেশি দোকান বসে। এসব দোকান থেকে মাসে অন্তত ২০ লাখ টাকার ওপরে খাজনা আদায় করা হয়। তবে তা সরকার পায় না, যারা হাট বসিয়েছেন, তাঁদের পকেটে ঢোকে প্রতিনিয়ত।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাজারটি পরিচালিত হলেও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এটি ইজারা দেয়নি। উপজেলা প্রশাসনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোনো হাট ও বাজার স্থাপন এবং উহার পরিসীমা সম্প্রসারণ ও সংকোচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করিতে হইবে। (২) উপধারা (১)-এর অধীন স্থাপিত হাট ও বাজারের মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত থাকিবে। এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করিয়া কোনো ভূমিতে কোনো হাট ও বাজার স্থাপন করা হইলে উক্ত ভূমিসহ উহাতে স্থিত সমস্ত স্বার্থ বা স্থাপনা সরকার বাজেয়াপ্ত করিতে পারিবে।’

বাজারের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিরিংগা শহরের কাঁচাবাজার সড়কে প্রতিদিন মাছ, মাংস, সবজি, ফলমূল ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি হয়। হক পরিবার নিজেদের জমি ও মার্কেট নির্মাণ করে বাজার বসিয়ে হাসিলের নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করছে। বাজারটির একটি অংশের খাজনা তোলেন মুজিবুল হক মনু, অন্য অংশে তোলেন তাঁর ভাই তৌফিকুল হক রিপন।

দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চকরিয়া পৌরসভার মৃত আব্দুল হকের (হক সাহেব নামে পরিচিত) দুই ছেলে মুজিবুল হক মনু ও তৌফিকুল হক রিপনের দোতলা নির্মাণাধীন মার্কেট রয়েছে। মার্কেটের নিচতলায় মাছবাজার ও মাংসের (গরু ও ছাগল) ১০০ থেকে ১১০টি গদিঘর (দোকানের জন্য বরাদ্দ জায়গা) রয়েছে। এসব দোকান থেকে শ্রেণিভেদে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা খাজনা আদায় করা হয়। এ ছাড়া মাছ ২৫০, মাংস ৩০০ টাকা ও ছাগলের গদিঘর থেকে খাজনা আদায় করা হয় ১০ হাজার টাকা। প্রথম তলায় কাঁচাবাজার, মুরগি, মুদি ও ডিমের ১০০-এর বেশি গদি রয়েছে। এসব প্রতিটি ঘর থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৪০০ টাকা খাজনা নেওয়া হয়।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হক মার্কেটের গলিতে রয়েছেও শতাধিক দোকান-গদিঘর। এসব ঘর থেকে হাসিল তোলা হয় ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। খাজনার পাশাপাশি বিদ্যুতের একটি লাইট ২০, জেনারেটর ২০, দারোয়ান ১০ ও ঝাড়ুদারের বেতন আদায় করা হয় ১০ টাকা। দৈনিক খাজনা দেওয়ার পরও এসব ব্যবসায়ীকে এককালীন ২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সালামি দিতে হয়েছে প্রতিটি দোকানের জন্যে।

হাটের মাছ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন খাজনা দিই। জমিদারের ইচ্ছা অনুযায়ী টাকা না দিলে মাছ বিক্রি করতে বসতে দেয় না। আমরা চরম কষ্টে আছি।’

সবজি ব্যবসায়ী কালাম উদ্দিন বলেন, ‘৮ থেকে ১০ ফুটের গদিঘর থেকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা খাজনা দিতে হয়। হক পরিবারের নিয়োজিত কিছু কর্মচারীর অত্যাচার তো আছেই।’

আমিনুল করিম নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘এ বাজারের ব্যবস্থাপনা ঠিক নেই। কোনো দোকানে পণ্যের তালিকা নেই। দোকানিরা ইচ্ছেমতো ক্রেতাদের কাছ দাম হাঁকিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সিন্ডিকেট করে হক সাহেবের পরিবার বাজারটি চালাচ্ছে। এতে সরকার বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।’

তৌফিকুল হক রিপন বলেন, ‘আমরা অংশীদারের জমিতে বাজার করেছি। কিছু লোক রেখে বাজার দেখাশোনা করা হয়। মূলত পুরো বাজারটি আমার বড় ভাই মনু সাহেব দেখেন।’

মুজিবুল হক মনু বলেন,‘বাজারের একটি অংশ আমি, অন্য অংশ আমার ভাই রিপন দেখাশোনা করেন। আমি মূলত পৌরসভাকে অবগত করে বাজারটি পরিচালনা করছি। আর কীভাবে করছি, সেটা সবাই জানেন।’ তবে খাজনার নামে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

চকরিয়া পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসউদ মোরশেদ বলেন, বাজার পরিচালনার ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। তবে মেয়র মহোদয়ের সাথে আলাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন। তবে তিনি নিয়মিত মালিক পক্ষের সাথে গোপন আতাঁত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ব্যক্তিমালিকানায় হাট-বাজার থাকার সুযোগ নেই। বাজারটি পৌর এলাকায়। এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বাজার বসানোর বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাঠকের মতামত: