ঢাকা,সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩

ভরাট কাজে কৃর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিকরা!

চকরিয়া উপকুলীয় অঞ্চলে কৃষিজমির কেটে মাটির টপসয়েল লুটের মহোৎসব

এম জিয়াবুল হক, চকরিয়া ::  কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়নে কৃষিজমির মাটি কেটে টপসয়েল লুটের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় কতিপয় মহল পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিমালা লঙ্ঘন করে এভাবে কৃষিজমির মাটি কেটে শ্রেণী পরিবর্তনপুর্বক টপসয়েল লুটের মতো পরিবেশবিধংসী কাজে জড়িত থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর কোনধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, উপজেলার পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের দরবেশকাটা পুর্বপাড়া এলাকায় কৃষিজমি কেটে মাটি লুটের পর স্থানীয় একটি কবরস্থান ভরাটের নাম দিয়ে ব্যক্তিগত বাড়িভিটা ভরাট কাজে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সরকারি কর্মসৃজন প্রকল্পের নিয়োজিত শ্রমিকদের। অভিযোগ উঠেছে, কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিকদের বেতন সরকারিভাবে ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হলেও কৌশলে তাদেরকে ব্যক্তিগত বাড়িভিটার ভরাট কাজে ব্যবহার করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা শ্রমিকদের মুজুরীর টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিষয়টি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ বছর আগে স্থানীয় মরহুম ছিদ্দিক আহমেদ চৌধুরীর তিনমেয়ে আয়েশা বেগম, রেহেনা জন্নাত, ফাতেমা জামিলা মুন্নী তাদের অংশের ৪৭ শতক জমি স্থানীয় মসজিদ কবরস্থানের জন্য দানপত্র করেন।

মুলত তাদের দানকৃত জমি থেকে মাটি কেটে কবরস্থানের ভরাট কাজ করা হচ্ছে। তবে সেখানে সরকারি কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিকরা ভরাট কাজে ব্যবহার হচ্ছে না এবং শ্রমিকদের মুজুরী হিসেবে কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি।

স্থানীয় লোকজন জানান, পশ্চিম বড়ভেওলা মৌজার বিএস ২২৯ ও ২৩০ নং খতিয়ানের ১০৯৩ দাগের কৃষি ও ভিটাজমির মালিক স্থানীয় মরহুম ছিদ্দিক আহমেদ চৌধুরীর ছেলে মনজুর আলম চৌধুরী গং। তার ওই জমির অংশ বিক্রি নিয়ে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি সিআর মামলা (৪৬৯/২০) রুজু হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, আদালতে ওই জমির অংশ নিয়ে মামলা থাকলেও তার রায়ডিগ্রি উপেক্ষা করে মনজুর আলমের বোন রেহেনা বেগম ও তার স্বামী আবদুল মজিদ স্থানীয় শাহাব উদ্দিন মিকারেরর সহযোগিতায় সম্প্রতি সময়ে ভারী স্কেভেটর গাড়ি নিয়ে এসে কৃষিজমি কেটে শ্রেণী পরিবর্তনপুর্বক মাটির উপরিভাগের অংশ টপসয়েল লুটের মহোৎসব শুরু করেছেন। বিষয়টি নিয়ে যাতে এলাকাবাসী কেউ প্রতিবাদ না করে সেইজন্য কৌশলের আশ্রয় নিয়ে কবরস্থান ভরাটের অজুহাতে কেটে নেওয়া মাটি সরকারি কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিক দিয়ে পরিবহন করে জমিতে বাড়িভিটার ভরাট কাজ করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাড়িভিটা ভরাটের আওতায় অভিযুক্তরা স্থানীয় জনগণের দীর্ঘ বছরের চলাচলের রাস্তাটিও দখলকৃত নিয়ে ভরাট করছেন । এ অবস্থার কারণে বর্তমানে স্থানীয় এলাকাবাসী চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম বড়ভেওলা থেকে ছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি কেটে মাটি লুটের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী চক্র কৌশলে জমি মালিকদের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে কিংবা কেউ নিজের জমি শ্রেণী পরিবর্তনপুর্বক ফসলি জমির টপ সয়েল বিক্রি অব্যাহত রেখেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, গেল এক মাস ধরে বিভিন্ন ইউনিয়নে জমির উপরি অংশ (টপ সয়েল) মাটি কেটে শ্রেণী পরিবর্তনের মাধ্যমে লুটের মহোৎসব চললেও কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তর রয়েছেন একেবারে নীরব। এ অবস্থার কারণে উপজেলার উপকূলীয় জনপদে কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে । এতে অদূর ভবিষ্যতে চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা করছেন কৃষি বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও পরিবেশ সচেতন মহল।

চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এসএম নাছিম হোসেন বলেন, মাটির উপরি অংশ (টপ সয়েল) ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টপ সয়েল কাটার ফলে কৃষিজমি উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। এভাবে কৃষি জমির উপকারী উর্বরতা হ্রাস পাওয়ায় ফসল উৎপাদনে ধ্বস নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, চকরিয়া উপজেলা খাদ্য উৎপাদনে একটি উদ্বৃত্ত উপজেলা। কিন্তু যেভাবে কৃষিজমি কেটে শ্রেণী পরিবর্তন করা হচ্ছে, বসতঘর নির্মাণ হচ্ছে, আবার মাটি লুটের মাধ্যমে জমিতে মৎস্যপুকুর নির্মাণ করা হচ্ছে, এতে ভবিষ্যতে কৃষিজমির পরিমাণ কমে সংকোচিত হয়ে চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এমআর মাহমুদ বলেন, বর্তমানে কৃষিজমির উপকারী উর্বর অংশ (টপ সয়েল) কাটার মহোৎসব চলছে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে। এসব মাটি ইটভাটা, পুকুর ও ভিটে ভরাট কাজে ব্যবহার হচ্ছে। একটি অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বিঘ্নে জমির টপ সয়েল কেটে পাচারে মেতে ওঠেছে। তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হচ্ছে, দেশে আইন কানুন নীতিমালা বলতে কিছুই নেই।

সরজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি সময়ে চকরিয়া উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের ঢেমুশিয়া, পশ্চিমবড় ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী, সাহারবিল ও পুর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নে তুলনামূলক বেশি ফসলি জমির মাঠে শোভা পাচ্ছে মাটিকাটার যন্ত্র (স্কেভেটর)। স্কেভেটর দিয়ে জমির উপরি অংশ কেটে ডাম্পার ও মিনি ট্রাকে ভর্তি নেওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এছাড়া পুকুর ও মানুষের ভিটে ভরাট কাজে ব্যবহার হচ্ছে এসব মাটি।

চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারি কর্মকর্তা (উদ্ভিদ ও সংরক্ষণ) মো.মহিউদ্দিন বলেন, কৃষিজমির উপরি অংশ হলো জমির প্রাণ। জমির ওপরের ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত মাটিকে উর্বর অংশ (টপ সয়েল) বলা হয়। মাটির ওই অংশই থাকে মূল জৈবশক্তি। এটি কেটে নেয়া হলে আর জমিতে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকেনা।

এব্যাপারে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান বলেন, কৃষিজমি কেটে মাটির টপসয়েল লুট বা জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা পরিবেশ আইনে নিষিদ্ধ। এইধরনের পরিবেশ বিধ্বংসী কাজে জড়িত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, যদি কারো বাড়িভিটা ভরাটের কাজে কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিক ব্যবহার করা হয়েছে, তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।##

পাঠকের মতামত: