ঢাকা,সোমবার, ১ মার্চ ২০২১

কক্সবাজারের শহর থেকে গ্রামে অবাধে চলছে মাদক কেনাবেচা

শাহীন মাহমুদ রাসেল ::  কক্সবাজার শহরের অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা বাজারঘাটা, পাহাড়তলী এবং বৌদ্ধ মন্দির সড়ক। সন্ধ্যা হলেই কিশোর তরুণ ও যুবকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এদের মধ্যে বেশিরভাগ মাদক কারবারি। আবার অনেকে আছেন সেখানে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করেন। এ কারণে সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের তেমন বিচরণ নেই।

সম্প্রতি সরেজমিনে সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তত ২০/২৫ জন ঘুরে ঘুরে এলাকায় মাদক বিক্রি করে আসছেন। ঠিক একইভাবে টেকপাড়া, পেশকার পাড়া, পৌরসভা মার্কেটের পেছনে, সাহিত্যিকা পল্লী, সিটি কলেজ গেইট, আলীর জাঁহাল, বিডিআর ক্যাম্প ও বাস টার্মিনালের আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাস্তার দুপাশে ছোটখাটো টং বা ভাসমান দোকানের অভাব নেই। এসব এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক কারবারীরা ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রি করছে।

এছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লারপাড়া, কলাতলী, লাইট হাউস, দরীয়া নগর, আদর্শ গ্রাম, হোটেল-মোটেল জোনসহ পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে একইভাবে মাদক বিক্রি হয়। এসব মাদকের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছেন, ভাসমান ও পথশিশু, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী, পাড়া মহল্লার বখাটে কিশোরদের একটি বড় অংশ। এদের বেশিরভাগ বিভিন্ন ধরনের নেশায় আসক্ত।

শুধু শহরেই নয়, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফ, সদর ও রামুসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন আগের চেয়ে মাদক কারবার কয়েকগুণ বেড়েছে। অভিভাবকদের অগোচরেই ভয়াল এই মাদক গিলে গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যত প্রজন্মকে। এতে অন্ধকারে ডুবছে শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যত।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যত প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকের কারণে সমাজে বাড়তে পারে প্রতিবন্ধী শিশু। বাধাগ্রস্ত হতে পারে মানুষের স্বাভাবিকতা। নষ্ট হতে পারে মানসিক, শারীরিক বিকাশ। বাড়তে পারে আত্মহত্যার প্রবণতাও। তাই যেকোনো মূল্যে শিশুদের সমাজকে মাদক থেকে রক্ষা করতে হবে।

সচেতন মহল বলছেন, মাদকের উৎপাদন ও চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। কঠোরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। মাদকাসক্তির কারণে সমাজে নানা রকম বিশৃঙ্খলা বাড়বে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের সহায়তায় মাদক কারবার চলছে। মাদকের টাকায় বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। মাদকের কারণে তরুণ সমাজ ছিনতাই, খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বর্তমানে বাস্তবায়নের চেষ্টা কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে চলছে তা নিয়ে তা বিভিন্ন এলাকার চিত্র দেখলেই বোঝা যায়।

সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়ের খরুলিয়া এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নয়াপাড়া-ডেইঙ্গাপাড়া গ্রামের বাঁকখালী নদীর ঘাটে প্রতিদিনই বসছে জুয়ার আসর। প্রতিদিন কয়েক লাখ লক্ষ টাকার জুয়া কেনা বেচা চলে এখানে। এছাড়া এ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় অবাধে চলছে মাদকের কেনাবেচা। এসব চিহ্নিত মাদক কারবারী ও মাদক সেবীদের প্রকাশ্য বিচরণ আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এলাকা বাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তাদেরকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে খড়গ। বিশেষ করে এ এলাকায় মাদক কারবারিদের নিরাপদ স্থান হওয়ায় নির্বিঘ্নে ইয়াবার পাশাপাশি চলে ফেনসিডিল, বাংলামদ, গাঁজা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক।

এলাকাবাসীর তথ্যমতে, এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেশি লক্ষ্য করা যায় বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্চুক এ এলাকার কয়েক মুরব্বির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারীদের মধ্যে রয়েছে, মমতাজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম ও মুসলিম, ফজলের ছেলে রিয়াজ উদ্দিন ও আফলাতুন, পকেটমার আলমের ছেলে এরশাদ উল্লাহ, আব্দুল খালেকের ছেলে বাদশা, মৃত আব্দুল মোনাফের ছেলে ছালাম মিয়া, মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে আব্দুল খালেক, মোহাম্মদ শফির ছেলে রাহামত উল্লাহসহ আন্তত ২০ জন। এরা মাদকের টাকায় এলাকায় আলিশান বাড়ি গাড়ির মালিক হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে মাঝে মধ্যে পুলিশ এসব মাদক কারবারীদের দু-একজনকে আটক করলেও গডফাদাররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একজন সচেতন ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে বলেও অজ্ঞাত কারণে এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোন জোড়ালো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই বন্ধও হচ্ছে না তাদের মাদক কারবার।

এছাড়া কোনারপাড়া গ্রামের গাঁজাটি পরিবারের অন্তত ১০ জন রয়েছে খুঁচরা মাদক বেচাকেনায়। এসব মাদকের ব্যাবসা বন্ধে প্রয়াজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় কোনারপাড়া নয়াপাড়া গ্রাম ছিল খরুলিয়া এলাকার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরী সবকিছুতে এ গ্রামের অনেক সুনাম ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে অত্র গ্রমে মাদক ছড়িয়ে পরার পর তরুন সমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ঠিক একইভাবে ডেইঙ্গাপাড়া, সিকদার পাড়া, ভূতপাড়া, ঘাটপাড়া, চেয়ারম্যান পাড়া, বেপারীপাড়া, দরগাহপাড়া ও সদরসহ জেলার প্রতিটি থানায় ব্যাপকভাবে বেড়েছে মাদক কারবার। স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা মাদকের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে অভিভাবকরা আছেন চরম দুঃচিন্তায়।

মাদকের রুট বাড়ছে: জেলায় মাদক ছড়িয়ে পরার পাশাপাশি রুটও পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কয়েক মাসের মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়া-বাইশারী সড়কের অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক পিস ইয়াবা জব্দ হয়েছে। বিভিন্ন ছোট যান বহনে (সিএনজি, মোটরসাইকেল) যোগে ইয়াবার চালান পাচার করা হচ্ছিল।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাদক কারবারী ও সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবেনা। আমাদের জেলা পুলিশের পুরো টিম নতুন তাই সবকিছু বুঝে উঠতে একটু সময় লাগছে।

পাঠকের মতামত: