Home » কক্সবাজার » এ যেন ‘ইয়াবা গ্রাম’

এ যেন ‘ইয়াবা গ্রাম’

It's only fair to share...Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

আজিম নিহাদ ::
পুরো এলাকা খোঁজে খুব কম ঘরই বের করা যাবে যে ঘরে ইয়াবা ব্যবসা নেই। যেন ইয়াবাই এই এলাকার মানুষের একমাত্র পেশা। কক্সবাজারের মানুষের কাছে এটি এখন ‘ইয়াবা গ্রাম’ হিসেবেই পরিচিত।
এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে কক্সবাজার শহরতলীর ঝিলংজা ইউনিয়নের বাসটার্মিনাল সংলগ্ন লারপাড়া এলাকায়।
এক সময় বাসটার্মিনালের আশপাশে বসবাসকারি মানুষ গুলো আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল না হলেও হাল সময়ে এদের বেশির ভাগই কোটিপতি। বিলাশবহুল বাড়ি, গেষ্ট হাউজ, পরিবহনসহ অঢেল ধন-সম্পদের মালিক। রাতারাতি তাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন তাক লাগানোর মতই।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আলাদ্বীনের প্রদীপের মত হঠাৎ আর্থিক পট পরিবর্তনের পিলে চমকানো তথ্য।
জানা গেছে, বাসটার্মিনাল ও লারপাড়া এলাকায় প্রায় ৮০ ভাগ মানুষই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। এরমধ্যে যেসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাভোগ করেছেন, এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ইয়াবা তালিকার অন্তর্ভুক্ত তাদের বেশ কয়েক জনের নাম অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এরা হলেন, লারপাড়ার সৈয়দ আকবর, আবুল হোসেনের পুত্র ইমাম হোসেন (রাজমিস্ত্রী), বাসটার্মিনালের নাইটগার্ড নজির আহমদের ছেলে মনু ওরফে বাইট্টা মনু, আবু তালেবের পুত্র মোছা, ইয়ার মোহাম্মদের পুত্র আজিজ, মৃত মোজাফ্ফরের ছেলে চানমিয়া, কবির আহমদ, নুর মোস্তফা, দেলোয়ার হোসেন, আবুল কালাম, মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনু, বশির আহমেদ, মৃত খুইল্যা মিয়ার ছেলে মো. হাসান, হাজিপাড়ার বকুল, ডিককুলের আবু নফর ওরফে বার্মাইয়া নফর ও বাবুল।
ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ আকবরের বাড়ি উত্তর লারপাড়া শশ্মান সংলগ্ন এলাকায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছেন। তার বাড়িতে প্রতিনিয়ত ইয়াবা সেবনের আসরও বসে। তার পক্ষে ইয়াবা পাচার করে তাঁর স্ত্রী। তিনি ইয়াবা নিয়ে পুলিশের হাতে অন্তত ২০ বার গ্রেপ্তার হন। কিন্তু তারপরও ইয়াবা ব্যবসা থেমে নেই। সূত্রমতে, সৈয়দ আকবর পাঁচ বছর আগেও মিনিট্রাকের হেলপার ছিলেন। পরে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক। তিনি একটি বিশাল সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেন। তার সিন্ডিকেট চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেটে ছড়িয়ে রয়েছে। তার বাড়িটি মূলত ইয়াবা গোডাউন। সেখান থেকেই তিনি সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে ইয়াবা পাচার করে থাকেন।
অনুসন্ধানে সৈয়দ আকবরের সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন রনি, আজিজুর রহমান, জয়নাল আবেদিন, জুবাইর, হোটেল ব্যবসায়ী রনি, আল আমিন, জিয়া, সোহেল, রিয়াজ উদ্দিন, খুরুশকুল এলাকার সৈয়দ আকবরের এক আত্মীয়, নুরু, ড্রাইভার আজিজুর রহমান, ঢাকার জনৈক মিরাজ, আব্দুচ সালাম। এরা সকলেই সৈয়দ আকবরের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করেন। এছাড়াও তাঁর হয়ে নিয়মিত পাচার কাজ করেন মিন্টু, বোরহান এবং তাঁর স্ত্রী।
ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনুর বাড়ি বাসটার্মিনাল সড়কের দক্ষিণ পাশে দক্ষিণ লারপাড়া এলাকায়। তিন বছর আগেও শ্যামলী পরিবহনের হেলপার ছিলেন তিনি। হেলপার থাকাকালিন সময়ে জড়িয়ে পড়ে পাচার কাজে। এক পর্যায়ে ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শ্যামলী পরিবহন থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু থামেনি ইয়াবা ব্যবসা। রমরমা ব্যবসা করে বর্তমানে কোটি টাকার মালিক।
জানা গেছে, তাঁর ইয়াবা পাচারের তথ্য পুলিশকে জানানোর কারণে কয়েক মাস আগে নিরীহ এক ব্যক্তিকে অপহরণ করেন মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনু। পরে তাকে কলাতলীর পারমাণু শক্তি কমিশনের পাশে একটি হোটেলে আটকে রেখে টানা চারদিন নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেয়া হয়। তাঁর অন্যতম সহযোগি ঈদগাঁও এলাকার শাহিন নামে এক ব্যক্তি।
ইয়াবা ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি বাসটার্মিনাল সড়কের দক্ষিণ পাশে। তার পরিবারটি স্থানীয়দের কাছে স্ক্র্যাব ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। দেলোয়ার স্ক্র্যাব ব্যবসার পাশাপাশি গাড়ির হেলপার হিসাবেও কাজ করতেন। তিন বছর আগেও পাহাড়ের উপর জরাজীর্ণ মাটির ঘরে গাদাগাদি করে থেকে জীবনযাপন করতো তাঁর পরিবার। কিন্তু এখন সেই হাল নেই। ইয়াবা ব্যবসা করে কোটিপতি দেলোয়ার। ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে দুবার গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগও করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ইয়াবা তালিকায়ও তার নাম শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু তাঁর ইয়াবা ব্যবসায় বিন্দু পরিমাণ ভাটা নেই।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে দেলোয়ার অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এক বছর আগে বাসটার্মিনাল সড়কের দক্ষিণ পাশে চারতলা বিশিষ্ট বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। কয়েক মাস আগে সড়কের উত্তরপাশে পাহাড় কেটে নির্মাণ করেছেন একটি আলিশান গেষ্ট হাউজ। ‘হোসেন’ গেষ্ট হাউজ নামে ওই গেষ্ট হাউজে মূলত গেষ্ট থাকেন না। যারা ওই গেষ্ট হাউজে থাকেন তাদের বেশির ভাগই তার সিন্ডিকেটের ইয়াবা পাচারকারি ও ব্যবসায়ী। দেলোয়ারের চারটি নোয়া গাড়ি রয়েছে। এছাড়া ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহনও রয়েছে তাঁর। বর্তমানে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থেকে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।
একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত কলাতলী এলাকার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী মুফিজের অন্যতম সহযোগি ছিলেন দেলোয়ার হোসেন। মুফিজের মৃত্যুর পর থেকেই পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।
আরেক শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী খুইল্যা মিয়ার ছেলে মো. হাসান। এক সময় তিনিও গাড়ির হেলপার ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তাঁর অস্বাভাবিক আর্থিক পরিবর্তন হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, হাসানের সিন্ডিকেটের বেশির ভাগই শ্যামলী ও অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভার এবং হেলপার। এছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্যরাও তাঁর পাচার কাজে জড়িত। হাসানের আপন ভাগিনা বিশাল ইয়াবার চালান নিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। সম্প্রতি তার এক ভাইও ইয়াবা নিয়ে গ্রেপ্তার হয়। হাসানও এক সময় ইয়াবা সহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ওই সময় তিনি ছয় মাস কারাভোগ করেন। কলাতলী উত্তর আদর্শগ্রামে একটি বাড়িকে তিনি ব্যবহার করেন ইয়াবা গোডাউন হিসাবে। সেখান থেকেই ইয়াবা পাচার করেন তিনি। এক সময়ের লোড আনলোডের শ্রমিক এখন টেকনাফ লাইনের বাস, ইজিবাইকসহ অনেক গুলো গাড়ির মালিক।
উত্তর লারপাড়া এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী নুরুল মোস্তফা। নুরুল মোস্তফা দুবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার দুটি মামলা রয়েছে। তারপরও বেপরোয়াভাবে তিনি ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
লারপাড়া এলাকার আরেক শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ করিম। তাঁর ইয়াবা ব্যবসার স্টাইলই ভিন্ন। চলাফেরা করেন সিনেমার ভিলেন স্টাইলে। তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াবাসহ হত্যা ও অন্যান্য ডজনাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু তাঁকে আটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন কোন তৎপরতা নেই।
সম্প্রতি কক্সবাজারের চকরিয়ায় এসএ পরিবহনে মোটর সাইকেল ও ১৭ হাজার ইয়াবা রেখে পালিয়ে যায় দুই যুবক। পরে পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজের মাধ্যমে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়, ওই দুই যুবকের বাড়ি কক্সবাজার শহরতলীর লারপাড়া এলাকায়। তাদের একজনের নাম শামিম ও অপরজন আইয়ুব প্রকাশ খোকা বাবু হিসেবে পরিচিত। পরে চকরিয়া থানা পুলিশ ওই ঘটনায় মামলা দায়ের করে।
কক্সবাজার পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, লারপাড়া এলাকায় এমন কোন ঘর নেই যে ঘরে ইয়াবা ব্যবসা নেই। এই এলাকাটি এখন কক্সবাজারের মানুষের কাছে ‘ইয়াবা গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। প্রশাসনের কড়াকড়ি না থাকার সুযোগে সেখানকার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, বাসটার্মিনাল ও লারপাড়া এলাকা থেকে ২০১৭ সালে অন্তত অর্ধশতাধিক ইয়াবা পাচারকারি ও ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। কিন্তু তারা জামিনে বের হয়ে পূণরায় ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দীন খন্দকার বলেন, বাসটার্মিনাল ও লারপাড়া এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী ও পাচারকারিদের তালিকা পুলিশের কাছে এসেছে। কঠোরভাবে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইয়াবার আগ্রাসন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ‘নির্দিষ্ট’ কয়েকজন গডফাদার রয়েছে। তাদেরকেও সনাক্ত করা হয়েছে। এখন কৌশল অবলম্বন করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানী কমা-ার মেজর মো. রুহুল আমিন বলেন, লারপাড়া ও বাসটার্মিনাল এলাকায় ভয়াবহ ইয়াবার আগ্রাসন চলছে। তিনি যোগদানের পর থেকে অন্তত ১৫ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী ও পাচারকারিকে গ্রেপ্তার করেছেন। কিন্তু কোন অবস্থাতেই থামছে না।
তিনি আরও বলেন, পুরো এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। শিগগিরই সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

চট্টগ্রামে পানির ট্যাংক থেকে মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার

It's only fair to share...000জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম :: খুলশী থানাধীন ফ্লোরা আটার মিল এলাকার নির্মানাধীন একটি ...