ঢাকা,শুক্রবার, ১ মার্চ ২০২৪

জেলায় তেলের চাহিদা মেটাতে আবাদ বেড়েছে সরিষার

কক্সবাজার প্রতিনিধি :: # জেলায় ২ হাজার টনেরও বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা জেলায় চলতি বছর বেড়েছে সরিষা আবাদি জমির পরিমাণ। প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বেশি জমিতে এবার সরিষা বুনেছেন চাষীরা।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘অনান্য বছরের তুলনায় এ বছর সরিষার সর্বোচ্চ ফলন পেতে যাচ্ছে কক্সবাজার। একবছরের ব্যবধানে দুইগুণ বেড়েছে সরিষার চাষ। এছাড়া ভোক্তা পর্যায়ে ভোজ্যতেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে সরিষা চাষ। আবাদি জমি বাড়ায় বাড়ানো হয়েছে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও। বেড়ে ওঠা গাছ আর ফুল দেখে অধিক ফলনের স্বপ্ন দেখছেন জেলার হাজার হাজার চাষি। জেলার চকরিয়া, রামু, পেকুয়া, সদরসহ বেশকিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে দিগন্তজোড়া মাঠ ছেয়ে গেছে সরিষার হলদে ফুলে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ভালো ফলনের প্রত্যাশা সরিষা চাষীদের।’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘কম খরচ, কম পরিশ্রম আর অল্পসময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় বলে সরিষা চাষে আগ্রহ বেড়েছে চাষীদের। ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ করে বিঘা প্রতি চলতি মৌসুমে গড়ে সাত-আট মণ সরিষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিঘা প্রতি সাত মন সরিষা উৎপাদনে দাম কেজিতে ১০০ টাকা করে হলে দাঁড়ায় ২৮ হাজার টাকা।’

চাষীরা বলছেন, ‘সরিষা তেলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরিষার দাম এখন বেশ ভালো।বাজার পরিস্থিতি এমন থাকলে এবারো সরিষা বিক্রি করে ভালো আয় করা যাবে। গত বছর প্রতি মণ শুকনা সরিষা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় এবারের রবি মৌসুমে আলুর বদলে উন্নত মানের সরিষার বীজ বপন করেছেন চাষীরা। মাত্র ৭৫ দিনের ফসলটিতে সেচেরও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। চাষের সময় সামান্য সারেই পর্যাপ্ত ফলন পাওয়া যায়। এক বিঘা জমির সরিষা বিক্রি করে সব খরচ বাদে ৯ থেকে ১১ হাজার টাকা হাতে পান কৃষক।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ‘চলতি মৌসুমে ৮ টি উপজেলার ৩ হাজার ২’শো চাষিকে সরকারি প্রণোদনা হিসেবে সরিষা বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আর-ও অনেক চাষিরা নিজ উদ্যেগে সরিষার আবাদ করেছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৮২৩ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত অগ্রগতি শতভাগ। যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৩৭০ হেক্টর। কেজি ৮০ টাকা পাইকারি দামে হিসেব করলে ১৮ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯২৫ হেক্টর। যেখান উৎপাদন হয়েছিলো ১২০৩ হেক্টর। একবছরের ব্যবধানে ৮৯৮ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। এরমধ্যে চকরিয়া- ৭৫০ হেক্টর, পেকুয়া – ৩৫০ হেক্টর, রামু- ২০০ হেক্টর, সদর- ২০০ হেক্টর, উখিয়া – ৬০ হেক্টর, টেকনাফ – ১৭৫ হেক্টর, মহেশখালী – ৬০ হেক্টর এবং কুতুবদিয়া- ২৮ হেক্টর।’ চকরিয়া কাকারা ইউনিয়নের চাষি নুর উদ্দিন তিন বিঘা জমিতে এবার সরিষা চাষ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘গত বছর দুই বিঘা জমিতে সরিষার চাষ করেছিলাম। খরচ পড়েছিল ৬ হাজার ৫’শ টাকা। এবার তিন বিঘাতে খরচ পড়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। গত বছর সরিষার দাম ভালো ছিল। এ বছর তিন বিঘাতে করেছি। জমিতে ফুল ফুটেছে। কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মীদের পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে আরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। এর পরেও আশা করছি ভালো ফলন হবে।’

ঈদগাহ উপজেলার রশিদ নগর ইউনিয়নের কৃষক মো: আলী হাসান বলেন, ‘ গত বছর দুই বিঘা জমিতে সরিষার চাষ করেছিলাম। দামও ভালো পেয়েছি। এবার তিন বিঘা জমিতে সরিষার চাষ করেছি। গতবারের তুলনায় খরচ বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, শুনেছি সরকার বীজ সার কতকিছু দেয়। কিন্তু আমার কপালে কোনদিন প্রণোদনা জুটেনি। কৃষি অফিসের কোনো উপসহকারীকেও দেখিনি।’

ফলন লক্ষ্য মাত্রা নিয়ে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘চলতি মৌসুমে কৃষক উন্নত জাতের সরিষা চাষ করেছেন। এ কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপসহকারী আশিষ কুমার দে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে সরিসার আবাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের তুলনায় এবছর দিগুণ সরিষার আবাদ বেড়েছে। অল্প খরচ ও অল্প সময়ে সরিষা আবাদ জেলার কৃষকরা লাভবান হওয়ার সরিষা চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে ফলন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো কবির হেসেন বলেন, ‘আমনের পরপরই পড়ে থাকা খালি জমিতে কৃষকেরা সরিষা ক্ষেত করেছেন। প্রতি বিঘা জমি থেকে ৫- ৭ মন সরিষা উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখান থেকে বিঘা প্রতি ফলনের ২৫ হাজার টাকা আয় হতে পারে। প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ২ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হবে। তিনি বলেন, গত বছর ৯২৫ হেক্টর সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যেখান থেকে ১০ কোটি টাকার সরিষা উৎপাদন হয়েছে। এবার ১৮২৩ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। যেখান থেকে ২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হবে। যার বাজার মূল্য ১৮ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা।’

কৃষি বিভাগ বলছেন, ‘গত বছরের চেয়ে প্রায় তিন লাখ হেক্টর বেশি জমিতে এবার সরিষার আবাদ হয়েছে, ফলনও বাম্পার। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ ভাগ স্থানীয়ভাবে মেটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে সরকার। সে লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে বিভিন্ন কার্যক্রম। চলতি মৌসুমে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্য থাকলেও আবাদ হয়েছে ১০ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে। গত মৌসুমে ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়। সে হিসেবে এবার ২ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে এই তেল জাতীয় ফসলটির আবাদ হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ভোজ্যতেলের ৯০ ভাগ দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। দেশের উৎপাদিত ভোজ্যতেল দিয়ে মাত্র ১০ ভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। ৯০ ভাগ ভোজ্য তেল আমদানি করতে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। সয়াবিন তেলের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সরিষা চাষের পরিধি বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। সরকারি নানা সহায়তা ও প্রণোদনার কারণে কৃষক এখন সরিষা চাষে অধিক উৎসাহ পাচ্ছেন বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

পাঠকের মতামত: