ঢাকা,মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪

বেলা ও সমকালের উদ্যোগে সেমিনারে

কক্সবাজার রক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

কক্সবাজার প্রতিনিধি ::  স্বাধীনতার ৫২ বছরেও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে ওঠেনি কক্সবাজার। দখল-দূষণে বিপর্যস্ত নগরীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ। আইনের তোয়াক্কা না করেই ইচ্ছামতো এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে হোটেল, মোটেলসহ ছোট-বড় স্থাপনা। অবৈধভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড়, চলছে বালু উত্তোলন। পর্যটন নগরীরকে এমন নাজুক পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার জরুরি। এ জন্য চাই সমন্বিত উদ্যোগ।

গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর হোটেল সিগালে আয়োজিত ‘বিপর্যস্ত কক্সবাজারের পরিবেশ ও প্রতিবেশ : করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বিশিষ্টজন। সমকাল ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এই আয়োজন করে। এতে পরিবেশ নষ্ট করার পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে।
সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য দেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বাপার সভাপতি ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল, এলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাহিদ ইকবাল, কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব আবুল হাসেম, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ আহমেদ, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা সারওয়ার আলম।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, কক্সবাজারে বালু উত্তোলন বড় সমস্যা। আছে দূষণ-দখলও। রিজার্ভ বনের ভেতরে গিয়েও ডুলাহাজারা এলাকায় তাঁরা বালু উত্তোলন করার প্রমাণ পেয়েছেন। উন্নয়নের নামেও ইচ্ছামতো বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

কক্সবাজারকে দখল-দূষণ, পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনকে একটি হটলাইন চালু করার পরামর্শ দেন তিনি। জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করার কথাও বলেন। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কেউ যাতে অনিয়ম করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে বলে তিনি মত দেন।

সুলতানা কামাল বলেন, কক্সবাজারের পরিবেশ ও প্রতিবেশ নষ্ট করার পেছনে জড়িত কারা, তা আমরা সবাই জানি। অথচ প্রশাসন তাদের চিহ্নিত করতে ভয় পায়। চিহ্নিত না করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন কীভাবে?

শামসুল হুদা বলেন, কক্সবাজারের সমস্যাগুলোকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরি। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। যারা দখল-দূষণ করছে, তাদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে পরিচয় তুলে ধরতে হবে।

খুশী কবির বলেন, কক্সবাজার একটি বিশেষ স্থান হওয়ায় এখানে অনেকের বিশেষ নজর থাকে। বাইরের অনেকে এখানে কিছু করতে চায়। পর্যটন নগরীকে বাঁচাতে সার্বিক চিন্তা, সম্মিলিত চিন্তা কীভাবে করা যায়, সেটাই আমাদের ভাবতে হবে।

অনুমতি না নিয়েই হোটেল-মোটেলসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে স্বীকার করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাহিদ ইকবাল বলেন, ‘৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলার লোকজনই কোনো না কোনোভাবে এখানে কিছু করতে চান।

বর্তমানে আমাদের প্রতিদিন তিন-চারটি রিট মামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আমরা আগে আইনি মোকাবিলা করতে চাই। পরে দখল-দূষণ, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই। উদ্বেগের বিষয় হলো অনিয়ম কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কক্সবাজারের বেশিরভাগ মানুষ জড়িত।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘বর্তমান কক্সবাজারকে রক্ষা করতে পারলেও অনেক কিছু করা যাবে। তবে এ জন্য সবার সচেতনতার বিকল্প নেই।’ কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, ‘অনেক স্থানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে খালি করেছিলাম। কিন্তু এখন সেগুলো আবারও দখল হয়ে গেছে। ভূত এসে সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলে। কক্সবাজারকে রক্ষায় কেবল সমস্যা চিহ্নিত না করে আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে।’

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘সমুদ্র তটের ৩০০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না বলে নিষেধাজ্ঞা আছে। তার পরও অনেকে তা অমান্য করে ইচ্ছামতো স্থাপনা নির্মাণ করছে।’ কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘বিপর্যস্ত কক্সবাজারকে বাঁচাতে কমিউনিটি গ্রুপ তৈরি করতে হবে।’

বন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। এসব সমস্যা সমাধানে পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট থাকতে হবে।’ বন কর্মকর্তা সারওয়ার আলম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কারণে বন বিভাগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ সেমিনারে কক্সবাজারের নানা-শ্রেণি পেশার নেতারা বক্তব্য দেন।
সভাপতির বক্তব্যে সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘আমাদের হাত-পা বাঁধা। তার পরও মনে করি, জনগণের সম্মিলিত শক্তি অনেক বড় শক্তি। জনগণের শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় এলাকায় এলাকায় সংগ্রাম কমিটি গঠন হওয়া দরকার। প্রয়োজনে কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলন গড়ে তুলে তা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, সব আন্দোলন একই সূত্রে গাঁথা।’ সরকার কক্সবাজার রক্ষায় একটি কমিশন করতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

পাঠকের মতামত: