ঢাকা,সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩

উজাড় হচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্য

প্রভাবশালীরা বিক্রি করছেন পাহাড়-টিলার মাটি ও গাছ

লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি ::  হাতির আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র হলো লোহাগাড়ার চুনতি অভয়ারণ্য। সেই অভয়ারণ্যের বুক চিরে চলে গেছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন। রেললাইন তৈরির জন্য কাটা হয়েছে অভয়ারণ্যের অসংখ্য পাহাড়। আর এখন ব্যবসার জন্য পাল্লা দিয়ে নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কাটছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। পাহাড়-টিলার মাটি ও গাছ বিক্রি করেন তারা। মাটি ও গাছ পরিবহনের জন্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে রাস্তাও। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে অভয়ারণ্যের বন্যপ্রাণী।

সরেজমিন দেখা যায়, চুনতি অভয়ারণ্য এলাকায় টিলা কেটে বালু বিক্রি করছে একটি প্রভাবশালী মহল। ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সুফিনগর বাঁশখালিয়া পাড়া সংলগ্ন লুতু মিয়ার ঘোনায় কেটে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে অনেক টিলা। এতে ধ্বংস হচ্ছে টিলায় থাকা গাছ ও সংলগ্ন রাতার ছড়ার বাঁধ। শুধু তাই নয়, কাটা হচ্ছে বন। উজাড় হয়ে যাচ্ছে অভয়ারণ্যের গাছগাছালি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই জিপ গাড়ি করে অভয়ারণ্য থেকে নামতে থাকে গাছ।

চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেনকে ম্যানেজ করেই অভয়ারণ্য উজাড় করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে পাহাড় ও বনজ গাছ কারা কাটছেন- এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফ উল্লাহ বলেন, তিনি যতদিন আছেন ততদিন লোহাগাড়ায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ও পাহাড় কাটতে দেবেন না। পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গত ১ আগস্ট ভ্রাম্যমাণ আদালত উপজেলার চুনতি ফোর সিজনের দক্ষিণ পাশের এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কাটার দায়ে কামরুল ইসলাম (৩৮) নামের একজনকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে। চুনতিতে পাহাড় কাটার অপরাধে শেকের আহমদ নামের এক ব্যক্তিকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অন্যদিকে, চুনতির রাঙা পাহাড়টি দুই বছর ধরে কাটা হচ্ছিল। পাহাড় থেকে দুই কোটি ২০ লাখ ঘনফুট মাটি কাটা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।  গত ১৪ অক্টোবর পাহাড় কাটার অভিযোগে ঘটনাস্থলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে অভিযান চালায়। সে সময় সেখান থেকে একটি ট্রাকও জব্দ করা হয়। পরে পাহাড় কাটার অভিযোগ এনে তমা কনস্ট্রাকশন, হাসান ইন্টারন্যাশনাল ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। জরিমানাও করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা চুনতি রাতার ছড়া, বয়না পুকুর, ফায়ার স্টেশন সংলগ্ন স্থান ও মহিলা কলেজের আশপাশে পাহাড় কাটছেন। তারা চুক্তিভিত্তিক পাহাড়গুলো মালিকের কাছ থেকে ক্রয় করেন। পরে বিভিন্ন স্থানে মাটি বিক্রি করেন। তবে পাহাড় কাটা হয় রাতের অন্ধকারে।

জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে সরকারি টিলা কেটে প্রতি গাড়ি বালু ১২০০-১৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন। পাহাড়খেকোরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রায় ৬ মাস আগে একই স্থানে টিলা কেটে বালু বিক্রির অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। জব্দ করা হয় স্তূপিকৃত বালু, যা পরে নিলামে বিক্রি করা হয়। এ সময় টিলা কাটার অপরাধে একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু এতে তেমন কোনো লাভ হয়নি; টিলাখেকোরা নতুনভাবে বালু ব্যবসায় মেতে উঠেছেন।

স্থানীয়দের মতে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয়ে টিলাখেকোরা এখন আগের মতো বালুর স্তূপ করেন না। তাৎক্ষণিক টিলা কেটে ট্রাকে করে বালু নিয়ে যান। তারা জানান, দিনে-রাতে বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারীদের প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। টিলার দিকে যাওয়ার পথে দেখা মেলে সারি সারি বালুভর্তি ট্রাকের। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে টিলা কাটার চিহ্ন থাকলেও দেখা যায় না যন্ত্রপাতি। টিলা কাটার পরপর যন্ত্রপাতি গায়েব করে ফেলেন তারা।

পাঠকের মতামত: