ঢাকা,মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪

সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অদম্য চকরিয়ার রায়হান

নিজস্ব প্রতিবেদক :: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী বাহার উদ্দিন রায়হান। সম্প্রতি স্নাতকোত্তর কোর্স শেষ করেছেন। তিনি সিজিপিএ ৩.১৩ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে রায়হানের সফলতার এই যাত্রাটা সহজ ছিলনা। বিভাগের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভিন্ন ছিল তার জীবন সংগ্রাম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পূর্ণ ছিল তার প্রতিটি ক্ষণ।

জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন। মায়ের আদরে বড় হতে থাকা রায়হান শৈশবে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে হাত দেওয়ার ফলে তার একটি হাত এবং অন্য হাতের কনুই পর্যন্ত কেটে বাদ দিতে হয়। কয়েকমাস যাবত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে ফিরে যান নিজ এলাকা কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার জহিরপাড়া গ্রামে। দুটি হাত না থাকায় পড়াশোনা নিয়ে ব্যাপক বেকায়দায় পড়েন। কিন্তু নিজের অদম্য ইচ্ছে আর মামাদের উৎসাহে পুনরায় পড়ালেখা শুরু করেন। তিনি পা দিয়ে না লিখে হাতের কনুই ও মুখ দিয়ে লিখতে শুরু করেন।

নিজ এলাকার আল রায়েদ একাডেমি থেকে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ২০০৮ সালে ভর্তি হন চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২০১৪ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। তার জিপিএ ছিল ৩.৪১। পরে বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন চকরিয়া কলেজে। নিজের আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় পড়ার খরচ মিটিয়ে ২০১৬ সালে পাস করেন উচ্চ মাধ্যমিক। ২.৩৩ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। পরে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। সিজিপিএ ২.৮৩ পেয়ে স্নাতক শেষ করেন। স¤প্রতি স্নাতকোত্তর কোর্স শেষ করেছেন। তিনি সিজিপিএ ৩.১৩ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

শিক্ষা জীবনের হিসাব চুকিয়ে এবার তিনি নেমেছেন চাকরির খোঁজে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজারে নিজেকে এগিয়ে রাখতে তার বিভিন্ন দক্ষতা রয়েছে। তিনি দেশের প্রথম অ্যাপভিত্তিক অনলাইন রেস্টুরেন্ট ‘খাবার লাগবে’ এর সিইও হিসেবে কাজ করেছিলেন। কোন স্থানে যাতায়াতের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার হিসেবে তিনি তৈরি করেন কেমনেযাব ডট কম (kemnejabo.com) এর মতো সাইট।

পড়াশোনায় এতটুকু আসা রায়হান পরিবারের অবদানকে বড় করে দেখেছেন। জানিয়েছেন, তার এতটুকু আসার পেছনে নানা বাড়ির অবদান সবচেয়ে বেশি। কারণ, নানার পরিবার তাকে মানসিক ও আর্থিকভাবে সাহায্য করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কারও সাহায্য নেননি রায়হান। নিজে অর্থনৈতিক কাজকর্ম করার চেষ্টা করেছেন। মায়ের দেখভাল করেছেন। এখন একটি চাকরি পেলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব তার পক্ষে।

দক্ষতা ও যথাযথ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শারীরিক প্রতিবন্ধিতার অজুহাতে জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে আছেন। এখনও তার কোনো চাকরি হয়নি। চাকরির জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নিজের অভিজ্ঞতা আছে বলে জানিয়েছেন রায়হান। তিনি বলেন, চাকরির জন্য নিজের যথাযথ যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছি। আমি ২০টিরও অধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছি। ব্রাকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় আমার আবেদন পেন্ডিং আছে। আমার বিভিন্ন দক্ষতা রয়েছে। আমাকে কোন প্রতিষ্ঠান যদি সুযোগ দেয় তাহলে আমি অনেক কিছু করে দেখাতে পারব বলে আশা করছি ।

 

পাঠকের মতামত: