Home » কক্সবাজার » রোহিঙ্গা আগমনে পর থেকে দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম

রোহিঙ্গা আগমনে পর থেকে দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম

It's only fair to share...Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

এম.বেদারুল আলম :
কক্সবাজারে দিন দিন বেড়েই চলছে শিশু শ্রম। বিশেষ করে রোহিঙ্গা আগমনের পর থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা শিশুরা শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ায় এ হার ক্রমশ বেড়েই চলছে। দারিদ্রতা, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, অনটনের সংসারে পরিবারকে আর্থিক যোগান দিতে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
শহরের লার পাড়ার বাস টার্মিনাল। এ টার্মিনালের পশ্চিম পাশ্বের একটি হোটেলে দুই বছর আগে গ্লাস বয় হিসেবে কাজ করে ৮ বছরের শিশু রিয়াদ। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা আবার কখনো ১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। বিনিময়ে মিলে ৮০ টাকা। এ ধরনের কাজে প্রতিদিনই কেউ না কেউ যুক্ত হচ্ছে। নিয়োগ দাতারা ঠকাচ্ছে প্রতিনিয়ত শিশুদের। বঞ্চিত হচ্ছে নায্য মজুরী প্রাপ্তি থেকে ও।
অন্যদিকে কলাতলির সী হোম কটেজে ১২ বছর বয়স থেকেই মাসে ১০০০ টাকার বিনিময়ে রুম বয়ের কাজ সদরের চৌফলদন্ডীর নুরুল ইসলাম ও লিমন। গত ২ বছরে তাঁর কাজের মাইনে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৫০০ টাকা। দরিদ্র বাবা লবন শ্রমিকের কাজ করে যার কারনে প্রাথমিকের গন্ডি পেরুতে পারেনি । এ ধরনের অনেক শিশু অর্থে ও অভাবে পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়ছে কম বয়সে।
রিয়াদ ও ইসলামের মত এমন হাজারো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত জেলার প্রত্যন্ত এলাকায়। শহরের বাস টার্মিনাল, চকরিয়া বাস টার্মিনাল, রামু বাইপাস, কলাতলির বিভিন্ন আবাসিক হোটেল- রেস্তোরাসহ প্রায় প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পাদন হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের দিয়ে। জেলার সব উপজেলা মিলে প্রায় ৪০ হাজারের ও বেশি শিশু শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত বলে বেসরকারি একটি সংস্থাসূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ শিশুই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে।
সরকারিভাবে জেলায় মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা জানা না গেলে ও বেসরকারিভাবে এবং কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা সূত্রে জানা যায়, এর সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫ হাজারের মতো। শ্রম আইন অনুযায়ী, শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করানো সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু আইন অমান্য করেই ছোট বড় সব প্রতিষ্ঠানেই বাড়ছে শিুশু শ্রমিকের সংখ্যা।
সরকারের গেজেট সূত্রে জানা যায়, সরকার ৩৮ ধরনের কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এগুলো হলো অ্যালুমিনিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামজাত, আটোমোবাইল, ব্যাটারি রিং চার্জিং, বিড়ি ও সিগারেট তৈরি, ইট বা পাথর ভাঙা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, সাবান বা ডিটারজেন্ট তৈরি, স্টিল ফার্নিচার বা গাড়ি বা মেটাল ফার্নিচার তৈরি, চামড়াজাত দ্রব্যাদি তৈরি, ওয়েল্ডিং বা গ্যাস বার্নার, কাপড়ের রং করা, চামড়ার জুতা তৈরি ভলকানাইজিং, মেটাল কারখানা, স্টিল ও মেটাল কারখানায়, সোনার দ্রব্যাদি বা ইমিটেশন বা চুড়ি, ট্রাক, টেম্পো ও বাস হেলপার, ববিন ফ্যাক্টরিতে, তাঁতের কাজ, ইলেকট্রিক মেশিনের কাজ, বিস্কুট বা বেকারি কারখানায়, নির্মাণ কাজ, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, কসাইয়ের কাজ ও কামারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ অন্যতম।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জেলার ব্যস্ততম কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লার পাড়া বাস টার্মিনাল, লিংক রোড, রামু বাইপাশ, ঈদগাও ষ্টেশন, খুটাখালী বাজার, চকরিয়া বাজার, চকরিয়া বাস টার্মিনাল, রামু ফকিরা বাজারসহ, জেলার ৫শতাধিক বিভিন্ন ফার্নিসারের দোকান, কলাতলির ২ শতাধিক আবাসিক হোটেল, ৫০টির মত ইট ভাটা, এমনকি বিভিন্ন্ সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বয় এর কাজ, গৃহস্থালির কাজে শিশু শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। শিশু সুরক্ষায় এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরবতার কারনে জেলায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। এছাড়া ৩ শতাধিক যাত্রীবাহী যানবাহনের সহকারী হিসেবে শিশুদের দায়িত্ব পালন করতে ও দেখা যায়।
শিশুশ্রমের কারণে একদিকে যেমন এসব শিশু খেলাধুলা, পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি তাদের স্বাভাবিক বিকাশও বিঘিœত হচ্ছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং শ্রমে নিয়োজিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, পরিবারের দারিদ্রতা, মা-বাবার কাছ থেকে সেবা বা যতেœর অভাব এবং শিশুর স্কুল পছন্দ না হওয়া প্রভৃতি। শিশুরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়া, সংসারে অর্থের জোগান দিতে শ্রমে নিয়োজিত হচ্ছে শিশুরা এমনটা মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ও ধনী গরিবের বৈষম্যকে শিশু শ্রম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন কক্সবাজার শেখ রাশেল শিশু কল্যান ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রের উপপরিচালক জেসমিন আক্তার। তিনি মনে করেন সামাজিক সচেতনতা, সরকারি সংন্থা ও বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণে শিশুশ্রম অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে অবশ্যই সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজের পরিধি গুটি কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজের গতি বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, কক্সবাজারে মূলত শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু, হকার পর্যায়ের শিশু যারা ঝিনুক বিক্রি করে দিনাতিপাত করে তাদের আধিক্য বেশি। আমাদের দায়িত্বে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানে ২০২ জন শিশু আছে । এছাড়া সমাজসেবা কার্যালয় ও শিশুদের নিয়ে কাজ করে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলো শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এগিয়ে আসে তাহলে শিশুশ্রম হ্রাস পাবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা আহসানুল হক শিশু শ্রম এবং তাদের অধিকার সর্ম্পকে বলেন, জেলায় কতজন শিশু শ্রমে নিয়োজিত এর সঠিক কোন পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই কারণ এটি শ্রম অধিদপ্তরের কাজ। তাছাড়া কক্সবাজারে শ্রম অধিদপ্তরের কোন অফিস কিংবা কর্মকর্তা ও নেই। ফলে এর সঠিক তথ্য না থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু কঠিন শিশু শ্রমে নিয়োজিত বিশেষ করে টমটম, সিএনজি, গাড়ির হেলপার হিসাবে তারা সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করে। তবে আশার কথা হচ্ছে শিশুদের নিরাপত্তা এবং অধিকার রক্ষায় কক্সবাজারে জানুয়ারি থেকে পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এখানে লেবার ইন্সপেক্টর ও দেওয়া হবে জানান শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা ।
আজকের শিশুরা আগামির ভবিষ্যৎ। তাদের মাঝে নিহিত রয়েছে আগামি দিনের ভবিষ্যৎ জাতির কর্ণধার। তাদের অধিকার রক্ষা এবং বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে সকলের এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন সচেতনমহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

চট্টগ্রামে পানির ট্যাংক থেকে মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার

It's only fair to share...000জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম :: খুলশী থানাধীন ফ্লোরা আটার মিল এলাকার নির্মানাধীন একটি ...