ঢাকা,মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১

সালাহউদ্দিন আহমদ গুম থেকে উদ্ধার হওয়ার অর্ধযুগ পূর্তি ১১ মে, মঙ্গলবার

মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী: : দু’হাজার পনের সালের ১১ মার্চ। দীর্ঘ ৬২ দিন গুম থাকার পর বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির বর্তমান সদস্য, তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে গলফ লিংক মাঠে কে বা কারা চোখ বাঁধা অবস্থায় রেখে যায়। স্থানীয় লোকজন সালাহউদ্দিন আহমদ’কে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় সেখানে দেখতে পান। সালাহউদ্দিন আহমদ তখন নিজের পরিচয় দিয়ে তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশকে খবর দেন। সে গুমাবস্থা থেকে উদ্ধার হয়ে জনসমক্ষে আসার ছয় বছর অর্থাৎ অর্ধ্বযুগ পূর্তি হচ্ছে-মঙ্গলবার ১১ মে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র মুখপাত্র হিসাবে সফলভাবে দায়িত্বপালনকালে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকাস্থ উত্তরার একটি বাড়ী থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে অচেনা মুখোশধারী অপহরনকারীরা সালাহউদ্দিন আহমদকে চোখ বেঁধে গুপ্ত স্থানে তুলে নিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন আহমদের পরিবার থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের বিষয়ে ঢাকার গুলশান ও উত্তরা থানায় জিডি করতে গেলে তখন জিডি নেয়া হয়নি। পরে সালাহউদ্দিন আহমদের সহধর্মিনী হাইকোর্টের শরনাপন্ন হলে সেখানেও রাষ্ট্রপক্ষ সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের কিছুই জানেননা বলে হাইকোর্ট’কে জানিয়েছিলেন।

তখন থেকে দীর্ঘ ৬২ দিন অজ্ঞাত স্থানে গুম অর্থাৎ নিখোঁজ থাকার পর একই বছরের ১১ মে সালাহউদ্দিন আহমদ’কে সর্বপ্রথম মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় মেঘালয় রাজ্যের শিলং এর গলফ লিংক মাঠে পাওয়া যায়। সেখান থেকে তাঁকে প্রথমে শিলং মানসিক হাসপাতালে, পরে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তাঁকে শিলং এর বিশেষায়িত হাসপাতাল নিমগ্রিসে ভর্তি করানো হয়। মেঘালয় রাজ্যের পুলিশ ২০১৫ সালের ৩ জুন ভারতে অবৈধ প্রবেশের অভিযোগ এনে বৈদেশিক নাগরিক আইনের ১৪ ধারায় সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রথমে হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরে শিলং জেলে পাঠানো হয়। পরে শিলং আদালত থেকে শিলং শহর ছেড়ে না যাওয়ার শর্তে সেখানকার বিজ্ঞ আদালত সালাহউদ্দিন আহমদকে জামিন প্রদান করেন।

তখন থেকে নির্বাসিত অবস্থায় দীর্ঘ ৬ বছর ধরে খাসিয়া খ্রীষ্টান অধ্যুষিত এলাকা শিলং শহরে বিঞ্চপুর সানরাইজ গেষ্ট হাউজ নামক একটি দোতলা ভাড়া বাড়ীতে তিনি বসবাস করে মামলা পরিচালনা করে আসছেন। মামলা দায়েরের পর মেঘালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করে ২০১৫ সালের ২২ জুলাই মামলার চার্জশীট দেয়া হয়। চার্জশীটে “সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলার গ্রেপ্তারী পরোয়ানা এড়াতে উদ্দ্যেশ্য প্রনোদিতভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়”। সালাহউদ্দিন আহামদের কৌশুলী ভারতের বিখ্যাত আইনজীবী এস.পি মোহন্ত জানান, ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই মামলার বাদী-আসামীর জবানবন্দি, সাক্ষীর সাক্ষ্য, জেরা, শুনানী, যুক্তিতর্ক সহ সব ধরনের কার্যক্রম শেষ করে ২০১৮ সালের ১৩ আগষ্ট সর্বপ্রথম মামলাটি রায়ের জন্য ধার্যদিন রাখা হয়। কিন্তু মামলার রায় ঘোষনার ধার্য্য তারিখ পরপর ৬ বার পিছিয়ে ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর সালাহউদ্দিন আহমদকে বেকসুর খালাস প্রদান করে শিলং আদালতের প্রথম শ্রেণির
ম্যাজিস্ট্রেট ডিজি খার সিং রায় ঘোষনা করেন।

প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের এই রায়ে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’কে সালাহউদ্দিন আহমদকে দ্রুততম সময়ে সমস্ত রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে হস্তান্তর করার জন্য বিচারক নির্দেশ দেন। সালাহউদ্দিন আহমদ আদালতের রায় অনুযায়ী সে দেশের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনি গত ২০১৯ সালের এপ্রিলে সালাহ উদ্দিন আহমদ বেকসুর খালাস পাওয়া রায়ের বিরুদ্ধে শিলং জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ আপীল করে।

ফৌজদারী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের কোন স্বার্থ নাথাকা সত্বেও রাষ্ট্রপক্ষ নিম্ম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে কেন এ আপীল করল সেটা খুবই রহস্যজনক। এ আপীল মামলাকে সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বিরুদ্ধে চলমান গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ আপীল মামলার কারণে সালাহউদ্দিন আহমদের আর দেশে আর ফেরা হয়নি।

সালাহউদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী, কক্সবাজার-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে শিলং আদালতের কার্যক্রম গত প্রায় ১৪ মাস ধরে বন্ধ থাকায় রাষ্ট্রপক্ষের করা আপীল মামলাটির কোন অগ্রগতি নেই। বিষয়টি সেখানকার আদালতের ব্যাপার। তাদের করার কিছুই নেই। তাই আপীল মামলাটি কখন নিষ্পত্তি হবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, সালাহউদ্দিন আহমদ ইন্টারপোলের আসামী নন। তাই ইন্টারপোলের সহায়তায় তাঁকে দেশে ফেরানো যাবেনা। তাঁর মতে, ভারত ও বাংলাদেশের দু-দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করে সালাহউদ্দিন আহমদ এর দেশে ফেরার বিষয়টি সুরাহা করা যায়। আবার সালাহউদ্দিন আহমদ এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশও ২৭ টি মামলা রয়েছে।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসিনা আহমদ গণমাধ্যমকে আরো জানান, আগে সালাহউদ্দিন আহমদের সাথে সাক্ষাত করতে শিলং যাওয়া গেলেও এখন সীমান্ত বন্ধ থাকায় ভারতে যাওয়াও বন্ধ রয়েছে। হাসিনা আহমদ বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদের স্বাস্থ্যের অবস্থা আগের চেয়ে দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। হার্টের সমস্যা, কিডনী’র সমস্যা, ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। শিলং এ অবস্থানকালে কিডনী ও মুত্রতলীতে অপারেশন করেছেন। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেননা তিনি। বিভিন্ন জটিল রোগ তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে। নিঃসঙ্গ থাকতে থাকতে দুঃচিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন তিনি। আবার বাংলাদেশে হাসিনা আহমদ তার সন্তানদের নিয়ে কিভাবে চরম কষ্টে দিনযাপন করছেন, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে কক্সবাজারের রাজনীতির বরপুত্র সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁকে প্রদত্ত বেকসুর খালাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দায়েরকৃত আপীল মামলা আইনীভাবে মোকাবেলা করে স্বদেশে ফেরার ব্যাপারে সিবিএন-এর কাছে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তাঁর সহধর্মিণীর কাছে।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়ার দ্বীনের আলোকবর্তিকা মরহুম মৌলভী ছাঈদুল হক ও মরহুমা আয়েশা খাতুনের গর্বিত সন্তান সালাহউদ্দিন আহমদ পেকুয়ার শীলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছেন সাফল্যের সাথে। সালাহউদ্দিন আহমদ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে সম্মান সহ কৃতিত্বের সাথে মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত থাকাবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি ও পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বপালন করেন সফলতার সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত থাকাবস্থায় স্বৈরাচারী এরাশাদের জুলুম নিপীড়নের শিকার হন সুদর্শন, সে সময়ের তুখোড় ও দুঃসাহসী ছাত্রনেতা সালাহউদ্দিন আহমদ। আইনপেশায় যোগদানের উদ্দ্যেশে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে এডভোকেটশীপ পরীক্ষা দিয়ে সনদ লাভ করেন তিনি। ১৯৮৫ সালে তিনি দেশের সবচেয়ে অভিজাত ও মর্যাদাপূর্ণ চাকুরী হিসাবে পরিচিত বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে কৃতিত্বের সাথে উন্নীত হয়ে সরকারি চাকুরীতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারি সচিব হিসাবে দায়িত্বপালনকালে সালাহউদ্দিন আহমেদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সহকারি একান্ত সচিব (এপিএস) হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগ দেন। এপিএস হিসাবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্বপালনকালে সালাহউদ্দিন আহমদ নিজ জেলা কক্সবাজারের উন্নয়নের প্রতিও তিনি বেশ মনযোগী হন।

১৯৯৬ সালে তিনি লোভনীয় সরকারি এই চাকুরী ইস্তফা দিয়ে কক্সবাজার-১ আসন থেকে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে সালাহউদ্দিন আহমেদ স্বাধীনত্তোর কক্সবাজার জেলা থেকে সর্বপ্রথম যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। একই সাথে তিনি কক্সবাজার জেলার ইনচার্জ মিনিষ্টার হিসাবেও সফলতার সাথে দায়িত্বপালন করেন। একই বছরের ২৭ এপ্রিল কর্মপাগল সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলা হতে কিছু অংশ নিয়ে পৃথক পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠা করেন। পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কক্সবাজার জেলায় মোট উপজেলার সংখ্যা ৮ টিতে উন্নীত হওয়ায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনিকভাবে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলায় উন্নীত হয়। উন্নয়নের ফেরিওয়ালা হিসাবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত সালাহউদ্দিন আহমদ ১/১১ সরকারের রোষানলে পড়ে ২০০৮ সালে কারাগারে থাকাবস্থায় তাঁর সহধর্মিনী এডভোকেট হাসিনা আহমেদ একই আসন থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯৬ সালে প্রথমে কক্সবাজার জেলা বিএনপি’র আহবায়ক ও পরে জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা বিএনপি’র সফল সভাপতির দায়িত্বপালন করেন। তাঁর কক্সবাজার জেলা সভাপতির দায়িত্বপালনকালীন সময়ে কক্সবাজার জেলা বিএনপি একটি দূর্ভেদ্য দূর্গতে পরিণত হয় এবং কক্সবাজার জেলা বিএনপি সারাদেশে আদর্শ রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ২০১০ সালে বিএনপি’র পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সালাহউদ্দিন আহমেদ কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব, পরবর্তী ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং তাঁর সহধর্মিনী এডভোকেট হাসিনা আহমদ জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। নিজ আসন কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) তে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার অধিকারী সালাহ উদ্দিন আহমেদ-হাসিনা আহমেদ দম্পতি ইন্ঞ্জিনিয়ার সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ, পারমিস আহমেদ ইকরা, ফারিবা আহমেদ রায়দা ও সৈয়দ ইউসুফ আহমেদ নামক ৪ সন্তানের গর্বিত জনক ও জননী। ৪ সন্তানের মধ্যে ২ সন্তান দেশের বাইরে থাকেন এবং অপর ২ সন্তান নিয়ে হাসিনা আহমদ ঢাকায় থাকেন।

 

পাঠকের মতামত: