ঢাকা,মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০

পেকুয়ায় ওয়ার্ড আ’লীগ সভাপতির ৩৩ মামলা; জিম্মি এলাকাবাসী

বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের পূর্ব অংশে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকার মূর্তিমান আতংক বারবাকিয়া ২নং ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের নামে রয়েছে ৩৩ মামলা। দূর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার চুরি-ডাকাতি, নারী ধর্ষণ চেষ্টা,স্কুল ছাত্রীকে যৌন-হয়রানী বন নিধনসহ ৩৩ মামলার আসামী বনের রাজাখ্যাত জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন মামলায় কয়েকবার কারাভোগ করলেও বিগত ৬ মাস আগে ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতির পদটি ভাগিয়ে নেয়ার কারণে প্রভাব দেখিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের হাজার হাজার বাসিন্দাদের জিম্মি করে রেখেছে।

তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও বারবাকিয়া ইউনিয়ন আ’লীগ ও পেকুয়া উপজেলার আ’লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের প্রভাব দেখিয়ে বহু মানুষকে এলাকাছাড়া, মারধর করে আহত, পাহাড় নিধন করে অবৈধ বালু উত্তোলন করে চলছে। এছাড়াও মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে পেকুয়া থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারছেনা।

ইতিপূর্বে ওই বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন নিয়ে জাতীয়, স্থানীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় একাধিকবার তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে ৩৩ মামলা রয়েছে।তা হল পেকুয়া থানায় মামলা নং ১/০৯, ১০/১৩, ০৮/১৩, ০৯/১৩, ০১/১৩, ০৭/০৯, ০১/০৫, ০১/০৩, জিআর ১৮৭/১৪, ১৪/১৪, ০১/১২, ০৭/১৭, ০১/১৪, ১০৮/১৮ ,৪৫/১৩, ০১/১৩, ৮৮/১৭, ৪৮২/১৮, ০১/১৩, ৫৪/০৯, ০১/১৮। বন মামলা ১১/১৭, ২১/১৭, ৮২/১৭, ১৫৯/১৭, ৩১/১৫, ১১/১৭,। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২৮২/১৮, যৌন হয়রানি মামলা ০৫/১৮। সিআর ৬০৫/১৮, ৪৮২/১৮, ০৮/১৩, ৩১/১৫। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আনছারকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পেকুয়া থানায় মামলা রুজু হয়। যার মামলা নং ১৫/২০। এ সমস্ত মামলার মধ্যে বেশ কয়েকবার কারাভোগ করেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, পেকুয়া উপজেলার পাহাড়ী দুই ইউনিয়ন টইটং ও বারবাকিয়ার বাসিন্দারা এখন ওই সন্ত্রাসীর নির্যাতনের কাহিনী বলতেই ঢুকরে কেঁদে উঠেন। স্থানীয়দের বর্ণনা দেওয়া ভয়ংকর কাহিনী শুনলে যে কারো গা শিউরে উঠবে।

দীর্ঘ ৭/৮ বছর ধরে পেকুয়া উপজেলা দুই পাহাড়ী ইউনিয়ন বারবাকিয়া ও টইটংয়ের মধ্যবর্তীস্থানে গভীর জঙ্গলে ডাকাতদের আস্তানা গড়ে তোলে পাহাড়ের বাসিন্দাদের জিম্মি করে নানান ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড সংগঠিত করে আসলেও বরাবরই আইন শৃংখলা বাহিনীর নজরদারীর বাইরে রয়েছে।

সম্প্রতি এ প্রতিবেদক পেকুয়ার পাহাড়ি ঐ দুই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে সরেজমিনে পরিদর্শন করলে বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর অপরাধ ও নির্যাতনের বিস্তারিত লৌমহর্ষক ঘটনার চিত্র উঠে আসে। জাহাঙ্গীর পেকুয়ার পাহাড়ের যেন অঘোষিত বন রাজ্যের রাজা। আর সেখানে যারা বাস করেন তারা প্রজা।

জানা যায়, পেকুয়ার পাহাড়ে এ সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্দেশমতে সব কিছু চলে। বন বিভাগের পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, বন বিভাগের সৃজিত সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে বিক্রি,ঘর তৈরিতে চাঁদা, পাহাড়ি এলাকায় চুরি-ডাকাতি, পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের জায়গা জমি জোর পূর্বক দখল করে অন্যজনকে চড়াদামে বিক্রি, নারীদের যৌন-হয়রানিসহ আরো নানা ধরনের অপরাধই নিত্যসঙ্গী এই সন্ত্রাসী বাহিনীর।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পেকুয়া উপজেলার মধ্যে বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে গহীন বনে এ বাহিনীর অস্ত্রধারী লোকজন অবস্থান করলেও তাদের অত্যাচার নির্যাতনের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়না স্থানীয়রা। কেউ প্রতিবাদ করলে গভীর রাতে বা দিনদুপুরে অস্ত্রধারী বাহিনী গিয়ে ওই প্রতিবাদী ব্যক্তির বসতঘরে হামলাসহ ওই বাড়ীর নারীদের ধর্ষণের মতো হুমকি দেওয়া হয়।

গত ৫ বছরে ওই পাহাড়ি এলাকার ১০টি গ্রামের অন্তত: অর্ধশতাধিক নারী ওই বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যা সামাজিক মান সম্মানের ভয়ে প্রকাশ করতে পারছেন না ওই গ্রামের নির্যাতিত নারীদের পরিবার।

বনদস্যু জাহাঙ্গীর ও আলমগীরের নেতৃত্বে পাহাড়ী জনপদে গড়ে ওঠা সশস্ত্র বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে রয়েছে টইটংয়ের সোনাইছড়ি রমিজপাড়া, এবাদত খানা, জুগিরছড়া, ধনিয়াকাটার পূর্বপাড়া, নতুনঘোনা, বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালীসহ দুই ইউনিয়নের প্রায় দশ হাজার মানুষ।

অস্ত্রের মুখে সাধারণ মানুষের দখলীয় ভূমি বা বসতঘরের মাটি কেটে নিয়ে বিক্রি করে দেয়া, পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে বিক্রি করে চললেও বনবিভাগ থাকে নির্বিকার। তাই সরকারী ওই দপ্তরের দিকে অপরাধীদের সাথে আতাঁতের অভিযোগের আঙ্গুল স্থানীয়দের। এছাড়াও পাহাড়ি জনপদে মাদক ব্যবসা, নারী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে বনরাজা খ্যাত জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।

সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন অপরাধের কারণে একের পর এক মামলার কারণে কারাভোগ করতে থাকলে নিজে বাঁচার জন্য বাংলাদেশ আ’লীগে যোগ দেন। যোগ দিয়ে বাজিমাত করেন ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতির পদটি ভাগিয়ে নিয়ে। বারবাকিয়ার বাসিন্দা শিলখালী ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি ও উপজেলা আ’লীগের যুগ্ন-সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান ওয়ারেছির হাত ধরে ওয়ার্ড আ’লীগের পদটি ভাগিয়ে নেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

৩৩টি মামলা থাকলেও তার পক্ষ হয়ে পেকুয়া উপজেলা আ’লীগ ও বারবাকিয়া ইউনিয়ন আ’লীগের শীর্ষ নেতারা তাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আনছারকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় উল্টো তার পক্ষে বর্ধিত সভার নামে প্রতিবাদ সভা করে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দেন। তৃণমূল আ’লীগের কর্মী সমর্থকরা শীর্ষ এ সন্ত্রাসীর পক্ষ গিয়ে প্রতিবাদ সভা করায় আ’লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলেও অভিমত দেন। তাকে দল থেকে বহিস্কার করার জোর দাবী জানান তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

এবিষয়ে জানতে চাইলে বারবাকিয়া ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি আবুল শামা বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের নামে ৩৩টি মামলা আছে তা আমার জানা ছিলনা। যদি ভুক্তভোগীরা মামলার কপিগুলো আমাকে দেন তাহলে উপজেলা আ’লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা নিব।

৩৩টি মামলার আসামী জাহাঙ্গীর আলম কিভাবে ওয়ার্ড আ’লীগের দায়িত্ব পেলেন জানতে চাইলে উপজেলা আ’লীগের সাধারণ বলেন, এসব আমি জানতামনা। অবশ্যই পরে শুনেছি। পর্যায়ক্রমে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন।

পাঠকের মতামত: