ঢাকা,রোববার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৩

চকরিয়ায় আলোচিত শিশু ওয়াসীকে নদীতে ফেলে হত্যা, আসামি মুন্নীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া ::
কক্সবাজারের চকরিয়ায় আলোচিত আড়াইবছরের শিশু আল ওয়াসীকে নদীতে ফেলে হত্যার অভিযোগে মামলার একমাত্র আসামি ঘাতক জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন কক্সবাজারের একটি আদালত। দীর্ঘ সাড়ে তিনবছর পর গত ১ ডিসেম্বর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুল­াহ আল মামুন মামলার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় একমাত্র আসামি জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি একলাখ টাকা অর্থ জরিমানাও করেছেন। জরিমানার টাকা অনাদায়ে বিচারক আরও দুইবছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন আদালতের সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মোজাফফর আহমদ হেলালী।
সাজাপ্রাপ্ত আসামি জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নী (২৭) চকরিয়া পৌরসভার বাটাখালী খোন্দকার পাড়ার এলাকার খলিলুর রহমানের মেয়ে। বর্তমানে মুন্নী কক্সবাজার জেলা কারাগারে রয়েছেন। অপরদিকে নিহত শিশু আল ওয়াসী চকরিয়া উপজেলার পুর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নের বাসিন্দা (বর্তমানে চকরিয়া পৌরসভা সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা) সাহাব উদ্দিনের ছেলে। মামলার বাদি রুনা ইয়াছমিন নিহত শিশুর মাতা।

মামলার এজাহার সুত্রে জানা গেছে, নিহত শিশু আল ওয়াসীর বাবা সাহাব উদ্দিনের সঙ্গে প্রেমের সর্ম্পক ছিল সাজাপ্রাপ্ত জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নীর। পরে অন্যত্র বিয়ে হলেও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি মুন্নীর সংসার। এরপর পুরনায় প্রেমিক সাহাব উদ্দিনকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেন মুন্নী। তাতে রাজি না হলে প্রেমিক সাহাব উদ্দিনের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেন জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নী।

ওই পরিকল্পনার অংশহিসেবে আসামি মুন্নী ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারী বিকালে চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ এলাকার বাসার সামনে খেলার করার সময় শিশু আল ওয়াসীর হাতে এক প্যাকেট চিপস দিয়ে তাকে কোলে তুলে নেন। পরে সবুজবাগের পশ্চিমপাশের বিলের মাঝখানের গলি দিয়ে স্বপ্নপূরী ক্লাবের সামনে যান মুন্নী আক্তার।

সেখানে অনেক্ষন অপেক্ষা করে সন্ধ্যার দিকে একটি ইজিবাইক টমটম যোগে পৌর শহরের চিরিঙ্গা পুরাতন বাসস্টেশনের সড়ক বিভাগের অফিসের সামনে গিয়ে নামেন। এরপর পায়ে হেঁটে মাতামুহুরী নদীর সেতুর মাঝখানে গিয়ে সুযোগ বুঝে নদীতে শিশু ওয়াসীকে নিক্ষেপ করে। সেখানে মুন্নী কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে। তখন শিশু ওয়াসীর কান্নাও শুনেন। পরক্ষণে শিশুটির মৃত্যু হয়।’ পরদিন ২২ জানুয়ারী সকালে পরিবার সদস্য, থানা পুলিশ মাতামুহুরী নদী থেকে শিশু ওয়াসীর মরদেহ উদ্ধার করেন।

এ ঘটনায় শিশু ওয়াসীর মা রুনা ইয়াছমিন বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু করেন। পরে চকরিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকরিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ ইসমাইল ঘটনার অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেন। এরই মধ্যে পুলিশ সবুজবাগ, স্বপ্নপুরী, ফুলতলা এবং চকরিয়া পৌরশহরের বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ পুর্বক শিশু ওয়াসীকে হত্যায় জড়িত ঘাতক জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নীকে সনাক্ত করেন।

এরপর হত্যাকাণ্ডে জড়িত একমাত্র আসামি মুন্নীকে তাঁর বাপের বাড়ি চকরিয়া পৌরসভার বাটাখালী খোন্দকার পাড়ার থেকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মুন্নীকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে তৎকালীন চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক রাজীব কুমার দেবের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় ঘাতক জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নী।

‘জবানবন্দিতে জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নী আদালতকে জানায়, শিশু আল ওয়াসীর বাবা সাহাব উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে দুজনের মধ্যে বিয়ের কথা থাকলেও তাকে ছেড়ে রুনা ইয়াছমিনকে বিয়ে করে সাহাব উদ্দিন। এ কারণে তার জীবন তছনছ হয়ে যায়। তাই সাহাব উদ্দিনের জীবনও দুর্বিষহ করে তুলতে তার শিশুপুত্রকে হত্যার পথ বেছে নেয়।’

আদালতের সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মোজাফফর আহমদ হেলালী বলেন, ২০১৯ সালের ১ আগস্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকরিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ ইসমাইল আদালতে অভিযোগপত্র (চাজর্সিট) দাখিল করেন। পরে আদালত ওইবছরের ২২ অক্টোবর মামলার চার্জ শুনানী শুরু করেন। সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বিজ্ঞ আদালত এ মামলার রায় ঘোষনা করেন। তিনি বলেন, রায় ঘোষনার আগে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মামলার একমাত্র আসামি জন্নাতুল ফেরদৌস মুন্নীকে আদালতে আনা হয়। পরে আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষনা করেন আদালতের বিচারক। ##

পাঠকের মতামত: