ঢাকা,সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০

আলো ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মোহাম্মদ আলী ::  সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিগত ৫৪ বছর ধরে এ বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি রয়েছে। গবেষণা, উদ্ভাবন সর্বোপরি মেধা বিকাশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রয়েছে অনন্য অবদান। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শুরুতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে নিয়োগ হন প্রফেসর ড. এ. আর. মল্লিক। যাত্রার শুরুতে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি এই চারটি বিভাগে ৫০ জন করে মোট ২০০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হয়। ৭ জন শিক্ষক ওই সময়ে ৪টি বিভাগে বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সারাদেশে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। পুরো দেশ থেকেই ছাত্রছাত্রীরা আসছে এখানে লেখাপড়া করতে; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কর্মচারীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে পার্বত্য আদিবাসী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ছাত্রছাত্রী বাঙালি সহপাঠীদের সাথে মিলেমিশে থাকছে ও লেখাপড়া করছে। ফলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ধারণ ও বহন করছে গোটা বাংলাদেশের পরিচয়।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। পাঠদানে রয়েছেন ৯২০ জন শিক্ষক। এখানে ৯টি অনুষদের অধীনে ৪৮টি বিভাগ ছাড়াও রয়েছে ৯টি ইনস্টিটিউট। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১৩টি আবাসিক হল ও ১টি ছাত্রাবাস। হলের মধ্যে ৮টি ছেলেদের ও ৫টি মেয়েদের হল। আর ছাত্রাবাসটি বরাদ্দ রয়েছে বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের জন্য। আবাসিক হল ও হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের জন্য ৬ হাজার ৪০৪ টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন বাসা ও কটেজে থাকছে আরও প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী। বাকি ১৪ হাজার শিক্ষার্থী থাকছে শহরস্থ বিভিন্ন বাসা ও মেসে। নগরের এ সকল শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে চলছে একজোড়া শাটল ও একটি ডেমু ট্রেন।

দেশের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপিঠ সমৃদ্ধ হয়েছে উপমহাদেশের খ্যাতিমান ভৌত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলাম, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেন, অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আবুল ফজল, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ আলী আহসান, মুর্তজা বশীর, ঢালী আল মামুন, সাবেক ইউজিসির চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মান্নানসহ দেশ বরেণ্য বহু কীর্তিমান মনীষীর জ্ঞানের আলোয়। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির যথেষ্ট সুনাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরীয়া প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী রক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য পেয়েছেন দেশি-বিদেশি নানা সম্মাননা, আরেক শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. শাহাদাত হোসেন দুটি নতুন মাছের প্রজাতি আবিষ্কার ও শনাক্ত করেছেন, ড. শেখ আফতাব উদ্দিন কম খরচে সমুদ্রের পানি সুপেয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার, ড. আল আমিনের লেখা বই যুক্তরাষ্ট্রের ৬টি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্স বুক হিসেবে নির্বাচন, অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী বঙ্গোপসাগর নিয়ে মানচিত্র তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক স্ব-স্ব ক্ষেত্রে রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। পিছিয়ে নেই শিক্ষার্থীরাও। ব্যাঙের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করে সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র সাজিদ আলী হাওলাদার, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে চবির কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র শাখাওয়াত হোসেন ও তার দলের নাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী দেশকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজেদের কাঁধে। বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, সদ্য চাঁদপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ১১ জন সচিব ও ৩০ জন অতিরিক্ত সচিব পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চবি’র সাবেক শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব পালন করছেন নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার সাথে ।

কেবল গবেষণা আর পড়াশুনা নয়, দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে এ বিশ্ববিদ্যালয় রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যার সাক্ষী। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চবি’র কমপক্ষে ১৫ জন মহানায়ক তাদের জীবন বিলিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মো. হোসেন পেয়েছেন বীর প্রতীক খেতাব।

সবুজ ঘেরা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন নজরকাড়া সব স্থাপত্যকর্ম। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রয়েছে স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার। মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর সন্তানদের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখেই নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সম্বলিত ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্য ‘জয় বাংলা’।

পাঠকের মতামত: