ঢাকা,সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

সিনহার স্বপ্নটুকু বাঁচাতে চাই -শিপ্রা

অনলাইন ডেস্ক ::   কক্সবাজারে শুটিং করতে যাওয়া ‘জাস্ট গো’ টিমের চার সদস্য সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও তাহসিন রিফাত নূর। কক্সবাজারে শুটিং করতে যাওয়া ‘জাস্ট গো’ টিমের চার সদস্য সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও তাহসিন রিফাত নূর। ঢাকার স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজের ছাত্রী শিপ্রা দেবনাথের ছিল ফিল্ম বানানোর নেশা; আর দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে যাওয়া সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের স্বপ্ন ছিল বিশ্বভ্রমণ। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে তাদের পরিচয়, বন্ধুত্ব; সেখান থেকেই ‘জাস্ট গো’র শুরু।
এর ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে চারজনের একটি দল, উদ্দেশ্য ছিল ট্র্যাভেল ডকুমেন্টারি তৈরি করা। সিনহা আর শিপ্রার সঙ্গে এই দলে ছিলেন সাহেদুল ইসলাম সিফাত আর তাহসিন রিফাত নূর।
চারজনের এই দলটি জুলাইয়ের শুরুতে কক্সবাজারে গিয়ে ডকুমেন্টারির জন্য কাজ শুরু করে। কিন্তু ৩১ জুলাই রাতে বাহারছড়া চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার মৃত্যু বদলে দেয় সব।
শিপ্রা বলছেন, তারা শুধু ‘জাস্ট গো’র জন্য শুটিং করতেই কক্সবাজারে গিয়েছিলেন, এর বাইরে আর কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না।
বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিনহার সঙ্গে পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, ডকুমেন্টারি নির্মাণের পরিকল্পনা, নওগাঁর আলতাদীঘিতে প্রথম ভিডিও শুটিং এবং এরপর কক্সবাজারে গিয়ে সিনহার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঘটনাবলীর বিস্তারিত তুলে ধরেছেন শিপ্রা।
সিনহা টেকনাফে ‘ইয়াবার কারবার ও ক্রসফায়ার নিয়ে’ ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং সেটাই তার ‘কাল হয়েছিল’ দাবি করে প্রচারিত খবরের সত্যতা নাকচ করেন শিপ্রা দেবনাথ।
“এটা সম্পূর্ণ গুজব। কক্সবাজারে ভিডিও ধারণ করার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। ওখানে একদম নির্দিষ্ট করে উল্লেখ ছিল, কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আমাদের নাই, শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধারণ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্যে ছিল না।
“ইস্যুকৃত এই কাগজটি সব সময় নিজেদের কাছে রেখেছি। কাগজটি সিনহার গাড়িতে সব সময় থাকত।”
তবে সিনহা হত্যাকাণ্ড বা মামলা সম্পর্কে বেশি কিছু বলতে চাননি শিপ্রা। তার ভাষায়, কোনো কথার কারণে এ মামলার ক্ষতি হোক, তা তিনি চান না। “আমি আগেও বলেছি, আমি জাস্টিস চাই। সিনহাকে কেন মারা হল, আমাদের কেন ধরা হল, আমরা কেন অনিশ্চিত একটা সময় কাটাচ্ছি, যে স্বপ্নের জন্য আমরা এত কিছু হারালাম, এত ঝড়-ঝাপটা পেরুলাম, সেই স্বপ্নটাও আসলে সাম হাউ কেউ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই স্বপ্নটুকু বাঁচাতে চাই, জাস্টিস চাই।
“আর যেহেতু আমি বিচার চাই, সেহেতু আমি চুপ থাকতে চাই। আপাতত তদন্তের স্বার্থে আমি চুপ করে থাকতে চাই।… আমি কোনো ভুল পদক্ষেপ নিতে চাই না এখন।”
শিপ্রা বলেন, “প্রতিটি সত্য, কী ঘটেছিল, কেন বা কাহারা বা কীভাবে এত কিছু- এর প্রতিটি সত্য আমি বলতে চাই। আমার বুকের ভিতরে খুব কষ্ট নিয়ে এইগুলো জমা করে রেখেছি। এর প্রত্যেকটি কথা আমি সবাইকে বলতে চাই। কিন্তু এর জন্য আসলেই আমার সময় লাগবে। আমি যদি এখনই সব কিছু বলে ফেলি, তাহলে এটা খারাপ হতে পারে। আমি চাই না, এই মামলার ন্যূনতম কোনো ক্ষতি হোক। এ কারণে আইনি কোনো কথা আমি বলতে চাই না। আমার স্বপ্নটাকে বাঁচানো জরুরি।”
এ কারণে আপাতত শুধু ‘জাস্ট গো’ নিয়েই কথা বলে যাচ্ছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সিনহা যে স্বপ্নটি দেখতে দেখতে মারা গেছে, যে স্বপ্নের জন্য মারা গেছে, আমি তো শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত সেই স্বপ্নটা মেরে ফেলতে দেব না। আমি সেই স্বপ্নটা বহন করতে চাই, শেষ পর্যন্ত।”
শিপ্রা জানান, বেড়ানোর আগ্রহ তার সব সময়ই ছিল। বছর দেড়েক আগে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে গিয়েই সিনহার সঙ্গে তার পরিচয় এবং পরে বন্ধুত্ব হয়।
“সিনহার পাগলামির জায়গা ছিল ট্রাভেলিং আর আমার ফিল্মিং। সিনহা সৃজনশীল ছিলেন, জ্ঞানী ছিল, প্রচুর পড়াশুনা করত। বন্ধু হিসেবে কখন মানুষ কাছে আসে, যখন তাদের চিন্তাভাবনার মিল থাকে। আমাদেরও তা-ই হয়েছিল।”
ঘোরাঘুরির এই আগ্রহ থেকেই তারা ভ্রমণ বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং তা ফেইসবুক, ইউটিউবে প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেন বলে জানান ফিল্মের ছাত্রী শিপ্রা। এই পরিকল্পনা থেকেই ‘জাস্ট গো’ নামের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেল খোলার সিদ্ধান্ত হয়।
“সিনহার মূল পরিকল্পনা ছিল বিশ্ব ভ্রমণ। যখন আমার প্ল্যান শুনল, বলল, এটা অনেক সহজ, এটা যদি করি, তাহলে ওয়ার্ল্ড ট্যুরটা করতে পারব একসাথে।”
ডকুমেন্টারির নাম কীভাবে ঠিক হল, সে কথা জানিয়ে শিপ্রা বলেন, “নাম ঠিক করা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এক সময় আমি মজা করে বলেছিলাম ‘জাস্ট গো’। সিনহা অনেকক্ষণ চিন্তা করল, তারপর বলল, ‘জাস্ট গো ইজ বেটার’। আর এভাবেই ‘জাস্ট গো’ নাম হয়।”
তাদের প্রথম কাজটি হয় গত মার্চ-এপ্রিলে নওগাঁর আলতাদীঘিতে। কিন্তু শুটিংয়ের ইকুইপমেন্ট সেখানে ছিল না বলে ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল একটি আইফোন দিয়ে। সেই ভিডিওটাই এখন অনলাইনে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে ভয়েসওভারের কণ্ঠটি সিনহার বলে জানান শিপ্রা।
তবে এখন জাস্ট গোর অফিসিয়াল পেইজে আলতাদীঘির যে ভিডিওটি আছে, সেটি আরও পরিমার্জিত সংস্করণ। সেখানে অন্য একজন পেশাদার আর্টিস্টের কণ্ঠ রয়েছে।
শিপ্রা বলেন, “জাস্ট গো-এর মাধ্যমে আমরা জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বই পড়ার অভ্যাস মানুষের কমে যাচ্ছে। সেই বিষয়টিকে নজরে আনা। দেশের ভেতরই আমরা কিছু জায়গাকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি, যে জায়গায় মানুষ সাধারণত যায় না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, কফি, বই আর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিক পণ্যকে সংগ্রহ করে সচেতনতা তৈরি করা।”
আলতাদীঘিতে কাজ শেষে পরবর্তী শুটিংয়ের জন্য কক্সবাজারকে বেছে নেন সিনহা, শিপ্র-সিফাতরা।
শিপ্রা বলেন, “ওই সময় খবর আসছিল, লকডাউনের কারণে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত অনেক পরিষ্কার ছিল, বিভিন্ন ধরনের কচ্ছপ আসছিল, সৈকতে ডলফিন আসছিল। এছাড়া কক্সবাজার থেকে বান্দরবান কাছে, খাগড়াছড়ি কাছে, চট্টগ্রাম কাছে। আমরা এক সাথে নদী, সমুদ্র, পাহাড় সবগুলো একসাথে একই জায়গায় পাব, জনসমাগম থাকবে না। আর সেজন্য আমরা কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছিলাম।” বিডিনিউজ24

পাঠকের মতামত: