ঢাকা,শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১

চট্টগ্রামে করোনা রোগীতে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ইপিজেড

কালের কণ্ঠ ::  সীমিত আকারে গত ২৬ এপ্রিল থেকে খুলে দেওয়ার পর চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পে করোনা প্রথম আঘাত হানে ৬ মে। এদিন কর্ণফুলী ইপিজেডে কেনপার্ক নামের একটি কারখানায় এক শ্রীলঙ্কান নাগরিকের নমুনায় করোনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এরপর গত ৯ দিনে চট্টগ্রামে মোট ১১ জন পোশাক শ্রমিক করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ১০ জনই চট্টগ্রামের দুই ইপিজেডে।

শ্রমিকদের করোনা আক্রমণের হাত ধরে তাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা শিল্প পুলিশের ৩ সদস্যও দুইদিন আগে করোনার নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছেন। তবে বাস্তবচিত্র আরো ভয়াবহ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নমুনা পরীক্ষার আওতায় না আসায় আরো অনেকে করোনা উপসর্গ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন। বাংলাদেশে করোনার হানার শুরুতেই চট্টগ্রামের সবচেয়ে ঘনবসতি ইপিজেড এলাকাকে ঝূঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন। দেরিতে হলেও তার সেই আগাম সতর্কতা বাস্তবরূপ দেখা দিয়েছে।

শিল্প পুলিশের তথ্য মতে, শিল্প কারখানার সাথে সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ১২ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে গার্মেন্টস কারখানার সাথে সংশ্লিষ্ট ৯ জন। এই ৯ জনের সবাই ইপিজেডে কর্মরত। অথচ এর বাইরে আরো একাধিক গার্মেন্টসকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছে যা শিল্প পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে নেই। যেমন চট্টগ্রামে আক্রান্ত প্রথম গার্মেন্টস কর্মকর্তা ওমর আলী। নগরীর উত্তর কাট্টলীতে অবস্থিত গারটেক্স গার্মেন্টসের জুনিয়র কমার্শিয়াল অ্যাসিসটেন্ট করনো আক্রান্ত হয়েছিলেন ৮ এপ্রিল। এরপর একে একে ওমর আলীর ৩ সন্তান ও স্ত্রীও করোনাভাইরাস আক্রান্ত হন। অবশ্য তারা সবাই এখন সুস্থ হয়ে বাসায় হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন।

চট্টগ্রামের এ কে গার্মেন্টস নামের কারখানার এক কর্মীও করোনা আক্রান্ত যিনি চট্টগ্রাম ইপিজেডের ইয়াংওয়ানের কর্মরত আরেক করোনা রোগীর ভাই। গত ৭ মে ৩১ ও ৩৫ বছর বয়সী এই দুই ভাই করোন পজিটিভ শনাক্ত হন। যদিও শিল্প পুলিশের তথ্যভান্ডারে এসব তথ্য নেই।

কালের কণ্ঠের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ১২ জন তৈরি পোশাক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শ্রমিক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ জন ইপিজেডের। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত কর্ণফুলী ইপিজেডে। শ্রীলঙ্কার মালিকানাধীন কেনপার্ক-২ ইউনিটে কোয়ালিটি সেকশনের এক শ্রীলঙ্কান নাগরিক গত ৬ মে করোনা আক্রান্ত হন। এরপর গত ৯ দিনে বেপজা নিয়ন্ত্রিত চট্টগ্রাম ইপিজেড ও কর্ণফুলী ইপিজেডে আরো ৯ জন করোনা রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এরমধ্যে ৭ জনই কর্ণফুলী ইপিজেডের।

জিবি বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি দুবাইভিত্তিক কারখানায় একজন নার্সসহ ৪ জন করোনা রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি পিপিইসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। এ ছাড়া কেনপার্ক-৩ ও পাওলো ফুটওয়্যারের আরো দুইজন অপারেটর করোনা আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চট্টগ্রাম ইপিজেডের কোরিয়ান মালিকানাধীন এইচকেডি ইন্টারন্যাশনালের একজন ও ইয়াংওয়ান গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের দুইজন কর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।

তবে করোনা আক্রান্ত হলেও এসব কারখানা লকডাউন করা হয়নি। সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আক্রান্ত হলেও উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখা যাবে না। খুব বেশি হলে আক্রান্ত ব্যক্তির সাহচর্যে যাওয়া সহকর্মীদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিন জ্বর নিয়ে প্রচুর শ্রমিক কারখানা গেইট থেকেই ছুটি নিয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন।

জানতে চাইলে কর্ণফুলী ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মশিউদ্দিন বিন মেজবাহ বলেন, ‘প্রতিটি কারখানায় প্রবেশ পথে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। থার্মাল স্ক্যানারে কারও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পেলেই বেপজা হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী তাদের সবেতন ছুটি কিংবা পরবর্তি চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আর কোনো কারখানায় কেউ করোনা আক্রান্ত হলে সে যাদের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে তাদের ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে।

একই কথা বললেন চট্টগ্রাম ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক খুরশিদ আলম। তিনি বলেন, ‘কেউ আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে যাতে সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়। অন্য কেউ যাতে সংক্রমণ না হয় সেজন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতেও বলা হয়েছে। যেহেতু অর্ডার আসছে, উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে তাই নিজেদের স্বার্থেই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

করোনা সংক্রমণে সর্বশেষ চট্টগ্রামে যুক্ত হয়েছেন কারখানার সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা শিল্প পুলিশ। গত ১৪ মে শিল্প পুলিশ, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২ কনস্টেবল ও ১ জন ক্লিনার করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এ কারণে একই ব্যারাকে থাকা ও আক্রান্তদের সংস্পর্শে যাওয়া আরো ৩১ জন শিল্প পুলিশের নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্য পুলিশ সদস্যদেরও ব্যারাক থেকে সড়িয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার কামরুল হাসান।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে সিভিল সার্জন অফিসের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। সুবিধামতো সময়ে টেকনিক্যাল পার্সনরা এসে আমাদের পুলিশ সদস্যদের নমুনা সংগ্রহ করবেন। আপাতত তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। তবে অন্য সদস্যদের করোনা মুক্ত রাখতে ইতিমধ্যে আমরা বেপজা স্কুল ও কলেজ ক্যাম্পাসে আমাদের ২০০ সদস্যকে সড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও জায়গার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

ঈদ পূর্ববর্তী শ্রমিকদের বোনাস ও বেতন নিয়ে যখন বিভিন্ন কারখানায় অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে ঠিক সেই সময়ে শিল্প পুলিশে করোনার হানা এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশের আইসোলেশনে যাওয়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। প্রায় সাড়ে ছয় শ জনবলের শিল্প পুলিশ, চট্টগ্রাম অঞ্চলে করোনা কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্বীকার করে কামরুল হাসান বলেন, ‘কিভাবে পুলিশ সদস্যরা করোনা আক্রান্ত হয়েছে সেটা বলা মুশকিল। কারণ যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে ডিউটি দেওয়া হয়েছিল। অন্য সহকর্মীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক তো ছড়িয়েছেই। আমরা তাদের মোটিভেট করছি। ডিউটিতো থেমে নেই।’ কালের কণ্ঠ

পাঠকের মতামত: