ঢাকা,রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

চকরিয়া-লামায় বন্য হাতির আক্রমণে নিহত অর্ধশতাধিক

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া ::  ব্যাপক হারে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বৃক্ষ নিধন, পাহাড় সাবাড়, অভয়ারণ্য ধ্বংস ছাড়াও হাজার হাজার একর বনভূমি দখল করে বসতি স্থাপনের কারণে দিন দিন আবাস হারাচ্ছে বন্য হাতির দল।

কক্সবাজারের চকরিয়া এবং বান্দরবানের লামা সীমান্ত এলাকার ১০ ইউনিয়নে এমন অবস্থা চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। এর ফলে বন্য হাতি তাদের প্রাকৃতিক আবাস হারানোর পাশাপাশি চরম খাদ্যসংকটে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই খাবারের সন্ধানে হাতির দল পাশের লোকালয়ে হানা দেয়।

এবার শীত মৌসুমের শুরু থেকেই খাবারের সন্ধানে প্রতিনিয়ত লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বন্য হাতির দল। দল বেঁধে আসা বেপরোয়া হাতির দল পাকা ধানের ক্ষেত তছনছ করা ছাড়াও গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বসতবাড়ি। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, বন্য হাতির দল একের পর এক মানুষকে পিষে মারছে, অনেকেই হয়ে যাচ্ছে জীবনের তরে পঙ্গু। কক্সবাজারের চকরিয়া আর পাশের বান্দরবানের লামার পাহাড়বেষ্টিত কয়েকটি ইউনিয়নে এখন হাতি-আতঙ্ক বিরাজ করছে। বন্য হাতির কবল থেকে ফসলি জমি, বসতবাড়ি আর নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে রাত জেগে পাহারায় থাকতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। অনেক সময় পাহারায় থাকা মানুষকেও হত্যা করছে হাতির দল।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, গত দুই বছরে চকরিয়া ও লামা উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ১০টি ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে বন্য হাতির আক্রমণে। এলাকার বাসিন্দা গৃহস্থ, কৃষি মজুর, কাঠুরিয়া বা পাহারাদার কেউ রক্ষা পাচ্ছে না হাতির আক্রমণ থেকে। অন্যদিকে গত এক মাসে চকরিয়া ও লামায় মারা পড়েছে পাঁচটি বন্য হাতি। প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস ছাড়াও এ অঞ্চলে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটার দূষণে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাতিগুলোর মৃত্যু হয়ে বলে জানায় বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মহল।

সর্বশেষ গত বুধবার ভোরে চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের আলীর ঘোনায় ধানক্ষেত পাহারারত কৃষক জবিন্দ্র বড়ুয়াকে (৪৫) পায়ের তলায় পিষে হত্যা করে বন্য হাতি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্য হাতির উপদ্রব বেড়ে গেছে চকরিয়া উপজেলার হারবাং, বরইতলী, সুরাজপুর-মানিকপুর, বমুবিলছড়ি, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, ফাইতংসহ দুই উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে।

সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম চকরিয়া নিউজকে বলেন, ‘নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ে হাতির চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বন ও পাহাড় উজাড়ের পর হাজার হাজার একর বনভূমিতে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার কারণেই বন্য হাতি বারবার লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।’

আজিম আরো জানান, গত এক বছরে তাঁর ইউনিয়নের অন্তত ১০ জনসহ চকরিয়া ও লামা সীমান্তের ১০টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক শিশু ও নারী-পুরুষ নিহত হয়েছে হাতির আক্রমণে। তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিনিয়ত বন্য হাতির আক্রমণে মানুষ মারা যাওয়ার খবর শুনতে শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, কিন্তু এই তাণ্ডব রোধ করা যাচ্ছে না।’

সীমান্ত ইউনিয়নগুলোতে বন্য হাতির উপদ্রব প্রসঙ্গে একাধিক জনপ্রতিনিধি ও সচেতন লোকজন জানান, একটা সময় ছিল বন বিভাগ ত্বরিতগতিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে বন্য হাতির গতিপথ পরিবর্তন করে দিত। কিন্তু এখন সেই ধরনের তৎপরতা চোখে পড়ে না।

চেয়ারম্যান আজিমসহ স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, সরকারিভাবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে বন্য হাতির উপদ্রব অনেকাংশে কমে আসত। পাশাপাশি পাহাড় কাটা ও নির্বিচার বৃক্ষনিধন বন্ধ করাসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে হাতির অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, চকরিয়া ও লামার সীমান্তবর্তী ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের মাঝখান দিয়ে চলাচল ছিল বন্য হাতির। এ কারণে বন বিভাগ চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের ফাঁসিয়াখালী বন বিটের উচিতারবিল মৌজায় হাতির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু গিয়াস উদ্দিন নামে সরকার দলের প্রভাবশালী এক নেতা সংরক্ষিত ওই বনাঞ্চল দখলে নিয়ে সেখানে ইটভাটা স্থাপনসহ শতাধিক পাহাড় কেটে সাবাড় করে ফেলেন।

কয়েক বছর আগে বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ কবির লিখিতভাবে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানান। পত্রে তিনি চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিনের কারণে উচিতারবিল মৌজায় হাতির অভয়ারণ্য তৈরি করতে না পারা এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড়ে প্রত্যক্ষভাবে তাঁর জড়িত থাকার বিষয়ে অভিযোগ জানান।

পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেলে অভয়ারণ্য তৈরির উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ে। অন্যদিকে বর্তমানে উচিতারবিল মৌজায় দিনরাত সমানে পাহাড় সাবাড়ের ঘটনা চলমান রয়েছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও প্রশাসনের লোকজন পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহস করে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের পাঁচটি বিটের কর্মকর্তারা চকরিয়া নিউজকে বলেন, বর্তমানে যেসব এলাকায় বন্য হাতি হানা দিচ্ছে, সেসব এলাকায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে হাতি তাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর পরও হাতির আক্রমণে যারা মারা যায় তাদের তালিকা তৈরি করে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

এসব ব্যাপারে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান চকরিয়া নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবছর শীত মৌসুমে বন্য হাতির দল হানা দিচ্ছে পাহাড়ঘেঁষা ইউনিয়নগুলোর লোকালয়ে। যারা হাতির আক্রমণে মারা পড়ছে তাদের সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আর যারা ফসল হারাচ্ছে, তাদেরও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা থাকে প্রশাসনের।’

ইউএনও বলেন, ‘লোকালয়ে বন্য হাতির উপদ্রব কী কারণে হচ্ছে, তা নির্ণয়ের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোথাও পাহাড় সাবাড়সহ পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের খবর পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

পাঠকের মতামত: