ঢাকা,রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

ঘুষ লেনদেনের ২ শতাধিক ব্যাংক একাউন্ট

দুদকের অনুসন্ধান ।। এলএনজি পাইপলাইন নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ ।। চক্রের হাত থেকে রক্ষা পায়নি প্রতিবন্ধীও

ইকবাল হোসেন ::  সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী মোল্লা বাজার এলাকার বাসিন্দা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মোজাহার হোসেন। আনোয়ারা-ফৌজদারহাট এলএনজি পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে সীতাকুণ্ড অংশে অধিগ্রহণের সময় তার জমিও নেওয়া হয়। নগরীর মুরাদপুর বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটি শাখায় তার একাউন্টে গত ১৫ অক্টোবর ১৮ লাখ ১০ হাজার ৯২২ টাকার অধিগ্রহণের চেক নগদায়ন হয়। পরের দিন ১৬ অক্টোবর তিনটি পৃথক চেকে ৩ লাখ ১১ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়। মূলত ভূমি অধিগ্রহণে পাওয়া অর্থের বিপরীতে ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয় ৩ লাখ ১১ হাজার টাকার এসব চেক। আর এসব চেক দেওয়া হয় দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া চেইনম্যান নজরুলের দোকান ‘ইয়ানা’তে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য। দুদকের অনুসন্ধানকারী টিম জানতে পারে, ঘুষের টাকা লেনদেন হয়েছে এমন দুই শতাধিক ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পেয়েছে দুদক। যেগুলোতে অধিগ্রহণের চেক জমা হওয়ার পরদিনই ঘুষের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। যে একাউন্টগুলো থেকে লেনদেন হয়েছে ঘুষের কোটি কোটি টাকা। ভুক্তভোগীদের সকলের বাড়ি সীতাকুণ্ড হলেও এসব ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে। সবচেয়ে বেশি খোলা হয়েছে মুরাদপুরে বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটি শাখায়; যেখানে নজরুলেরও ব্যাংক হিসাব রয়েছে। মূলত ঘুষের পাওনা নির্বিঘ্ন করতেই হাতের নাগালে ব্যাংক একাউন্ট করিয়ে আগেভাগেই স্বাক্ষরকৃত চেক নিয়ে নিতেন নজরুল।
ভুক্তভোগী মোজাহার দুদকের অনুসন্ধানকারী টিমকে জানান, তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। তিনি নজরুলকে দেখেননি। এলএ চেক ব্যাংকে জমা হওয়ার আগেই তিনটি চেকে স্বাক্ষর করে চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সে নজরুলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দিয়ে এসেছিলেন।
সাইদুল আজম ও সামশুল আজম দুই ভাই। তাদের বাড়িও সীতাকুণ্ডে। তাদের জমিও এলএনজি পাইপলাইন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। তারাও নগরীতে ব্যাংক একাউন্ট খুলেছেন নজরুলের ইচ্ছায়। তাদের ব্যাংক একাউন্টে গত ৩০ অক্টোবর এক কোটি ৪৫ লাখ টাকার অধিগ্রহণের চেক নগদায়ন হওয়ার পরদিনই ২৭ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন হয়। দুদক জানতে পারে এসব টাকাও ঘুষের জন্য উত্তোলন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের কেউ গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুই শতাধিক ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে; যেগুলো থেকে ঘুষের টাকা লেনদেন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একাউন্টধারীদের পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেউ ইচ্ছাকৃত ঘুষ দিলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। তবে কোনো ভুক্তভোগী বাধ্য হয়ে ঘুষ দিলে তাদের সাক্ষী করা হবে এবং বাধ্য হয়ে দেওয়া ঘুষের টাকাও যাতে ফেরত পান সেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ নভেম্বর নগরীর শপিং কমপ্লেঙ থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার চেইনম্যান নজরুল ইসলামকে নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৯১ লাখ টাকার ১০টি চেকসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২। দুদকের কাছে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল, নজরুলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইয়ানাতে ভূমি অধিগ্রহণের চেকের বড় অংকের কমিশন লেনদেন হবে। ওই সময় ঘটনাস্থল থেকে নজরুলের সাথে জেলা প্রশাসনের আরেক কর্মচারী তসলিমকেও আটক করে দুদক।
এর আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ (বর্তমানে মন্ত্রী) নজরুলসহ তিনজনকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশনা দেন। এরপর থেকে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয় নজরুলকে। তবে তিনি ফটিকছড়ি কর্মস্থলে না গিয়েই বেতন-ভাতা তুলতেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেইনম্যান নজরুল দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার সিন্ডিকেটের লোকজন ঘুষের চেক দেওয়া ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছেন। এলএ চেক পাওয়ার পর ঘুষের টাকার জন্য চেক দিলেও সিন্ডিকেট সদস্যদের পরামর্শে সেই চেক হারিয়ে গেছে মর্মে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন কয়েকজন। অথচ এসব চেক আগেই নগদায়ন হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইতোমধ্যে এলএ চেক গ্রহণ করার পর ঘুষের জন্য দেওয়া চেক হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে কয়েকজন থানায় জিডি করেছেন। মূলত গ্রেপ্তার হওয়া নজরুলের সিন্ডিকেট সদস্যরা তাকে বাঁচাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ঘুষ সিন্ডিকেটে অনেক রাঘববোয়ালও জড়িত। তবে এ সিন্ডিকেটে যারাই জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
নজরুলের রিমান্ড : দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া নজরুলকে নগদ টাকা ও চেকসহ হাতেনাতে আটকের মামলায় তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের আদালত এ আদেশ দেন বলে জানান চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের আইনজীবী কাজী ছানোয়ার আহমেদ লাভলু। এদিকে নজরুলকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিয়েছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, মহেশখালী থেকে আসা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের জন্য আনোয়ারা থেতে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৭৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আনোয়ারা- ফৌজদারহাট এলএনজি পাইপলাইন নির্মাণ’ প্রকল্প হাতে নেয় গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লি. (জিটিসিএল)। ওই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রায় ৩৫০ কোটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। আজাদী

পাঠকের মতামত: