Home » Uncategorized » সুশীলা সুন্দরী : বাঘের মুখে চুমু খেতেন, বাঘের থাবায় যায় প্রাণ

সুশীলা সুন্দরী : বাঘের মুখে চুমু খেতেন, বাঘের থাবায় যায় প্রাণ

It's only fair to share...Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

অনলাইন ডেস্ক ::

‘সার্কাস’ শব্দটির সঙ্গে ভারতীয়রা প্রাচীনকাল থেকে পরিচিত। কিন্তু তখন সার্কাসের খেলা যাঁরা দেখাতেন তাঁরা বেদুইন হিসেবেই গণ্য হতেন। বাঙালির প্রথম সার্কাস শুরু হয় নবগোপাল মিত্রের হাতে। সেখানে একটি ঘোড়া ও দুই একজন সদস্য নিয়ে কিছু জিমন্যাস্টিকের খেলাই দেখানো হতো।

নবগোপাল মিত্রের জামাই রাজেন্দ্রলাল সিংহ ১৮৮৩ সালে কিছু বিদেশি খেলোয়াড়ের সাহায্যে শুরু করেন ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস’। তা ছিল মূলত বিদেশি জিমন্যাস্টদের খেলা।

সে অর্থে প্রকৃত সার্কাস বলতে যা বোঝায় তার সূচনা ‘বোসের গ্রেট বেঙ্গল’ সার্কাসের হাত ধরে। এই সার্কাস কম্পানির মালিক ছিলেন ছোট জাগুলিয়ার মতিলাল বসু। তাঁর স্ত্রী রাজবালার হাত ধরেই প্রথম বাঙালি নারীর সার্কাসের জগতে পদার্পণ। রাজবালা ছিলেন মূলত ট্রাপিজ শিল্পী। ট্রাপিজ ও ব্যালেন্সের খেলা দেখেই তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সার্কাস জীবন ছিল খুবই অল্প সময়ের। কন্যা জন্মের পর খেলা থেকে তিনি সরে যান। তার কিছুদিনের মধ্যেই মতিলালেরও মৃত্যু ঘটে কঠিন অস্ত্রপচারের ফলে। মতিলালের মৃত্যুর পর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের কর্ণধার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর ছোট ভাই প্রিয়নাথ বসুর। তিনি ১৯০৯ সালে গ্রেট বেঙ্গল ভেঙে দিয়ে গড়ে তোলেন ‘প্রফেসর বোসেস গ্র্যান্ড সার্কাস’।

ইতিপূর্বে দাদার সঙ্গে দল নিয়ে ঘোরার সময় তাঁদের সার্কাসের খেলা দেখে খুশি হয়ে ১৮৯৬ সালে রেওয়া-এর মহারাজা তাঁদের উপহার দেন একজোড়া বাঘ। তাদের নাম দেওয়া হয় লক্ষ্মী ও নারায়ণ। অবিলম্বে সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠল বাঘের খেলা। সার্কাসের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন বাদলচাঁদ। বাঘেরা ছিল তাঁর নিতান্ত পোষ মানা। খাঁচার ভেতর ঢুকে রীতিমতো ‘বাঘের সাথে কুস্তি’ জুড়ে দিতেন তিনি। এমনকি খেলার শেষে সম্মিলিত দর্শকের চিত্কারকে উপেক্ষা করে বাঘের মুখে ঢুকিয়ে দিতেন নিজের মাথা!

অবশ্য এই সার্কাস দলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘সুশীলা সুন্দরী’। সার্কাসের দলে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখানো প্রথম ভারতীয় নারী। বাঙালি মেয়ে মাত্রই অবগুণ্ঠিতা– এ অপবাদ তিনি দূর করেন।

সুশীলা সুন্দরীর জন্ম ১৮৭৯ সালে এক বাঙালি হিন্দু পরিবারে। সেকালের বাবু কলকাতার লালবাতি এলাকার রাম বাগানে। জন্মদাত্রীর নাম রয়ে গেছে অন্ধকারেই। শোনা যায় অভাগী পতিতার দুই মেয়ে পেটের দায়ে এসেছিলেন সার্কাসে। অতঃপর তাঁর নাম বিখ্যাত হয়ে ওঠে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস -এর সুশীলা সুন্দরী হিসেবে। এটা তাঁর আসল নাম ছিল কিনা সেটা নিয়েও সংশয় আছে। তাঁর পরিবার সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায় না।

তবে জানা যায়, ছোটোবেলা থেকেই সুশীলার নানান রকম ব্যায়ামের দিকে প্রবল আগ্রহ ছিল। কলকাতার সিমলা অঞ্চলে প্রফেসর প্রিয়নাথ বোস ব্যায়ামের আখড়া খুললে সুশীলা ও তাঁর বোন কুমুদিনী সেখানে যোগ দেন এবং সার্কাসে যুক্ত হয়ে পড়েন। এবং খুব দ্রুতই অন্যান্য খেলার সঙ্গে বাঘের খেলা দেখাতে শুরু করেন।

এর আগে সার্কাসে বাঘের খেলা দেখানো হলেও সেই বাঘগুলোকে চেন দিয়ে বেঁধে তবে খেলা দেখানো হতো। গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধায় ‘গোপাল’ নামের বাঘের সঙ্গে কুস্তি লড়তেন। কিন্তু এই খেলায় বাঘের গলায় চেন পরানো থাকত। এবং সেই চেনের শেষপ্রান্ত থাকত অন্য এক লোকের হাতে। বিপদের বিন্দুমাত্র আশঙ্কা থাকলে সেই চেন টেনে বাঘকে সরিয়ে দেওয়া হতো।

সে অর্থে বোসেদের সার্কাসে বাঘ খোলা রাখা হতো। গ্র্যান্ড সার্কাসে বাদল চাঁদের পর যিনি এই খেলা দেখাতেন তিনি আর কেউ নন, এই বাঙালি মেয়ে সুশীলা। তাঁর খেলা দেখাবার সময় বাঘেরা থাকত মুক্ত। খাঁচার ভেতর ঢুকে সুশীলা বাঘকে আদর করতেন, চুমু খেতেন। তাঁদের নিজের কথামতো দাঁড় করাতেন, বসাতেন, গর্জন করাতেন। এমনকি তিনি তাদের সঙ্গে বাহুযুদ্ধও করতেন, তাদের বিস্তৃত চোয়াল জনসমক্ষে দেখাতেন। এর পর এসব খেলা দেখানোর পর তিনি তাদের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন ছবি তোলার জন্য। টানা আধঘণ্টার খেলার শেষে ছবি তোলা হলে উদ্ভাসিত দর্শকদের করতালির মধ্যে তিনি এসে দাঁড়াতেন স্টেজে।

বাঘের সঙ্গে খেলার জন্য সর্বাধিক আলোচিত হলেও তিনি আর একটি খেলা দেখতেন, সেটিও ছিল অতি বিখ্যাত -জীবন্ত সমাধি। সার্কাসের রিংয়ের এক কোণে সুশীলাকে গর্ত করে পুঁতে দেওয়ার পর সেই কবরের ওপর বেশ কিছু দর্শক ঝাঁপাঝাঁপি লাফালাফি করে দেখতেন, ঠিকমতো কবর দেওয়া হয়েছে কি-না। তার পর সেখানে ঘোড়ার খেলা দেখানো হতো। সেই শো শেষ হলে সুশীলা গর্তের মধ্যে থেকে হাসতে হাসতে স্টেজের ওপর উঠে আসতেন।

জানা যায় একবার সার্কাসে শো চলাকালীন সুশীলাকে কবর দেবার পর হঠাৎ ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টি নামে। সার্কাসের শো বন্ধ করে দিতে হয়। বাড়ি ফিরে প্রফেসর বোসের মনে পড়ে সুশীলাকে কবর থেকে তোলা হয়নি। তিনি দ্রুত ফিরে যান মাঠে। দেখেন সেই কবর থেকে সুশীলা গায়ের জোরে উঠে এসেছেন মাটি ফুঁড়ে।

পুরনো কলকাতার ইতিহাসে কান পাতলে শোনা যায়, গ্রেট বেঙ্গলের খ্যাতনামা জাদুকর, প্রিয়নাথের ডানহাত ম্যাজিশিয়ান গণপতির সঙ্গে মন দেওয়া নেওয়া হয়েছিল সুশীলার।

খ্যাতির মধ্য গগনেই সুশীলাকে সার্কাস থেকে সরে যেতে হয় এক দুর্ঘটনার জেরে। সুশীলা যে বাঘ দু’টিকে নিয়ে খেলা দেখাতেন তাদের একটি মারা গেলে নতুন এক বাঘ ‘ফরচুন’কে নিয়ে খেলা দেখাতে যান তিনি। এই বাঘটি তখনো পুরোপুরি ট্রেনিং পেয়ে উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। শোনা যায়, এই বাঘটির উপযুক্ত খাবার না পাওয়ার কারণে সেদিন তাকে আধপেটা করে রাখা হয়েছিল। সব খেলা শেষ করে সুশীলা যখন বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়েছিলেন তখন হঠাৎ বাঘটি থাবা দিয়ে জোরে আঘাত করলে ভীষণভাবে আহত হন তিনি। অতি কষ্টে সুশীলার প্রাণ রক্ষা হলেও ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে আর রিংয়ে ফেরা সম্ভব হয়নি তাঁর।

১৯২৪ সালের মে মাসে সুশীলার মৃত্যু হয়। আর তার সঙ্গেই অবসান ঘটে ভারতীয় সার্কাসের সর্বাপেক্ষা সাহসী, জনপ্রিয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কিংবদন্তি এক নায়িকার। আজ সার্কাসের মেয়েদের নানান খেলা দেখাবার সুযোগ থাকলেও ১২০-১৩০ বছর আগে সুশীলা সুন্দরী যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, যুগের প্রেক্ষিতে তাঁর তুলনা একমাত্র তিনিই।
সূত্র : এইসময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

দ্বীপ রক্ষার দাবিতে সেন্টমার্টিনে মানববন্ধন

It's only fair to share...27200টেকনাফ প্রতিনিধি :: দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ রক্ষা এবং স্থানীয়দের মৌলিক ...