Home » বিনোদন » হালিশহর সমুদ্র সৈকতে কী নেই!

হালিশহর সমুদ্র সৈকতে কী নেই!

It's only fair to share...Share on Facebook214Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্রগ্রাম ::

শ্বাসমূল, কাদামাটি, নোনাজল আর সবুজ ঘাসের বিছানা। সামনে সুবিশাল বঙ্গোপসাগর, পেছনে ম্যানগ্রোভ বন। অস্তাচলের সূর্যকে একান্তে বিদায় জানাতে যদি চান এর চেয়ে মনোরম পরিবেশ আর কোথায় পাবেন সৌন্দর্যপিপাসুরা! এমন অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ চট্টগ্রামের কাট্টলী সমুদ্রসৈকতে। কারও কাছে এটি রাসমনি ঘাট কিংবা বারুনী ঘাট, কারো কাছে হালিশহর সমুদ্রসৈকত। অবহেলিত সৈকতটি পর্যটকদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে শুধু অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে। চট্টগ্রাম শহরের কাছেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে আকর্ষণীয় এ সৈকতের অবস্থান। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয় সৈকত এই শহরের অনেকের কাছেও অজানা। সৈকত ঘুরে এসে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক : রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম

বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী বন্দর টোল সড়ক ধরে গেলে চোখে পড়বে রাসমনি ঘাট। ঘাটের নামার মুখেই নজরে পড়বে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বিশাল কর্মযজ্ঞ। সাগরের উপকূলজুড়ে পতেঙ্গা থেকে কাট্টলীর সাগরিকা এলাকা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার চার লেন ‘আউটার রিং রোড’ এবং শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে সিডিএ। যার নির্মাণ ব্যয় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সমতল থেকে ৩০ ফুট উঁচু রিং রোডের মাটি ভরাট করতে গিয়ে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কাটা হয়েছে সৈকতবর্তী এলাকা থেকে। যে কারণে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের। ফলে দর্শনার্থীরা মূল সৈকত ছেড়ে এখন পার্শ্ববর্তী ম্যানগ্রোভ বনকেই বেছে নিয়েছেন বেড়ানোর উপলক্ষ হিসেবে। যে বনের শুরু কাট্টলী এলাকায় আর শেষ হয়েছে ২৯ কিলোমিটার দূরের সীতাকুণ্ডে।

গত শনিবার কাট্টলী সৈকতে দেখা হয়, একটি ট্রাভেলার্স গ্রুপের সাথে। গ্রুপটি দুই সপ্তাহের সফরে এসেছে চট্টগ্রামে। তাঁরা কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, রাঙামাটি হয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে এসেছেন এ সমুদ্রোপকূলে। ৭ সদস্যের এই গ্রুপের অন্যতম ঢাকার লালমাটিয়া এলাকার শাহেদ।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিচের পাশেই এমন গালিচার মতো ঘাসের বিছানা, গাছের ছায়া এবং এই সাগর তীরের মতো এত বাতাস আমি আর কোনো সাগর তীরে পেয়েছি বলে মনে হয় না। সুন্দরবনের শ্বাসমূলের সৌন্দর্য কিছুটা হলেও উপভোগ করা যায়।’ সমুদ্রসৈকত থেকে জাহাজ দেখা, জেলেদের মাছ ধরা আর জেলেজীবন এখানে বাড়তি পাওনা তাঁর কাছে।

জানা গেছে, কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া তৌকীর আহমেদের আলোচিত ‘হালদা’ ছবির কিছু দৃশ্যায়ন এ সৈকতে হয়েছে। চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ বিভাগীয় স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মাঝে হঠাৎ হঠাৎ টিভি ক্যামেরা ঘুরে যায় এই সৈকতে। টিভি ক্যামেরার শক্তিশালী ফোকাসে ধরা পড়ে বহিঃনোঙরে দাঁড়ানো বাণিজ্যিক জাহাজ। ধারা ভাষ্যকারদের বর্ণনায় ফুটে ওঠে সৈকতের সৌন্দর্য। যা ছড়িয়ে পড়ে বহির্বিশ্বে।

জানা গেছে, কাট্টলী সমুদ্রসৈকত রানি রাসমনি বারুনী ঘাটে অসংখ্য পুণ্যার্থীর ঢল নামে। প্রতিবছর চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে সনাতনী সমপ্রদায়ের পুণ্যার্থী নর-নারী রানি রাসমণি বারুনী স্নানঘাট এলাকায় পাপমুক্তির প্রত্যাশায় পুণ্যতোয়া বঙ্গোপসাগরে স্নান করে।

এখানে প্রায় প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে দল বেঁধে পিকনিক করতে আসেন। কথা হয় মিরসরাই থেকে ঘুরতে আসা এক যুগলের সাথে। নিজামপুর কলেজের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র আশিকুল তারিফ বেড়ানোর জন্য এই সমুদ্রসৈকত এলাকা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের কাছে শুনছিলাম এ সৈকতের সৌন্দর্যের কথা। আজ নিজে এসেও অভিভূত হয়েছি। একই সাথে সমুদ্র আর ম্যানগ্রোভ বন দেখার সুযোগ সুন্দরবন ছাড়া আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই।’ তাছাড়া যোগাযোগ সুবিধাও এই সৈকতকে জনপ্রিয় করেছে বলে তিনি মনে করেন। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেনের সুবিধার কারণে খুব কম সময়ে এখানে আসা যায়।

সৈকতটি কোনো ধরনের প্রচার কিংবা সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় একটি বেড়ানোর স্পট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত মূল শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে। তবে যাতায়াতের ওই সড়কে তীব্র যানজটের কারণে অনেকেই যেতে চান না।

ম্যানগ্রোভ বন গবেষক ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মোহাম্মদ আবদুল বাতেন বলেন, ‘কাট্টলী সমুদ্রসৈকতে গেলে সুন্দরবনের একটা অনুভূতি পাওয়া যায়। গত ’৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় বনায়নের আওতায় কাট্টলী এলাকা থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টি করা হয়। কেওড়া গাছের চারা রোপণ করে বনটি সৃষ্টি করা হলেও একটা নির্দিষ্ট সময় পর এই গাছ মরে যাবে। তখন প্রাকৃতিক পর্যায়ক্রমের অংশ হিসেবে সেসব জায়গায় প্রাকৃতিকভাবেই গেওয়া গাছ প্রতিস্থাপন হবে।’

তাঁর মতে, ‘অন্যান্য সৈকতের তুলনায় এখানকার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন সৈকতটি কাদামাটির হওয়ার কারণে সমুদ্র কূলবর্তী বনটির মাটি সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত। এখান থেকে খুব চমৎকার সূর্যাস্ত দেখা যায়। গাছের নিচে সবুজ ঘাসে বসে সামনের খোলা সমুদ্রে এই সূর্যাস্ত দেখা সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি।’

যত অসুবিধা : পরিকল্পিত কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি এখানে। এমনকি বাঁধ থেকে সৈকতের দিকে যাওয়ার রাস্তাটিও চলাচলের অনুপোযোগী। বন বিভাগের মালিকানায় বনটি পুরো অরক্ষিত। নেই কোনো টয়লেট সুবিধা। এমনকি খাবারের জন্য ভালোমানের রেস্টুরেন্টের অভাব প্রকট। দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাও চোখে পড়েনি। বরং রিং রোডের জন্য মাটি সংগ্রহ করতে গিয়ে মূল সৈকতটি ক্ষতবিক্ষত করেছে ঠিকাদারের স্কেভেটর। ম্যানগ্রোভ বনে ঢোকার মুখে ‘নিঝুম পার্ক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসামাজিক কাজ পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।

জনপ্রতিনিধির বক্তব্য : স্থানীয় সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার মোরশেদ আকতার চৌধুরী বলেন, ‘সৈকতের পরিবেশ পর্যটকবান্ধব করা জরুরি। কিন্তু সৈকতের ঢোকার মুখে যে পার্কটি আছে তাদের বিরুদ্ধে ছোট ছোট ঘর করে অসামাজিক কাজের অভিযোগ আছে। পুলিশ প্রশাসনকে বলা হয়েছে অনেকবার। তাছাড়া রিং রোডের কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাও নেওয়া যাচ্ছে না। কারণ আমরা এখনও নিশ্চিত নই রিং রোড সৈকতের দিকে কতটুকু জায়গাজুড়ে হবে। কারণ ভরা বর্ষায় জোয়ারের পানি প্রায় বাঁধ পর্যন্ত চলে আসে। তাই এ উন্নয়নকাজ শেষ হলে আমরা সৈকতের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করব।’

যেভাবে যাবেন : চট্টগ্রামের যেকোনো স্থান থেকে অলংকার-এ কে খান-হালিশহর ফইল্যাতলী বাজার চলে যান। এরপর রিকশাচালককে জাইল্যাপাড়া-সাগরপাড় বললেই হবে। রিকশাভাড়া সব দিক থেকেই ৪০/৫০ টাকা। কিংবা চট্টগ্রাম কাস্টমস এলাকার পাশে টোল রোড দিয়েও যাওয়া যায় এ সৈকতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি পরীক্ষার রুটিন

It's only fair to share...21400চকরিয়া নিউজ ডেস্ক :: চলতি বছরের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী ...