Home » কলাম-ফিচার » সুষ্ঠু নির্বাচন : তিন চক্রকে সামাল দিতে হবে

সুষ্ঠু নির্বাচন : তিন চক্রকে সামাল দিতে হবে

It's only fair to share...Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

akhtaruzzamanসংবিধানের ১১৮ থেকে ১২৪ ধারা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন নিয়ে যা কিছু বলা হয়েছে তার কোথাও  কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে একটি কথাও নেই। তাই অনেকের ধারণা নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার ব্যাপারে সংবিধানকে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় নীরব রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা থাক বা না থাক তাদের খেয়ালখুশিমতো বা তাদের নিয়োগকর্তার ফরমায়েশ অনুযায়ী যে নির্বাচনই হোক না কেন, তা কোনো আদালতেই প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলে সংবিধান ১২৫ ধারায় নির্বাচনী আইন ও নির্বাচনের বৈধতার নামে নির্বাচন কমিশনকে দায়মুক্তি দিয়েছে। আজকে যে রাজনৈতিক সংকট তা মূলত সংবিধানের ১২৫ ধারার অপব্যবহার হওয়ার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে বলে সচেতন মানুষ মনে করে। রাজনীতিবিদদের অনেক ভালো গুণ থাকার পরও তারা প্রচণ্ড রকমের ক্ষমতালোভী। ক্ষমতার লোভের কারণে তারা প্রায়ই অন্ধ হয়ে যান এবং তাদের অনুভূতিও লোপ পায়। যার ফলে তারা যেমন নিজেদের ক্ষমতার বাইরে দেখতে চান না, তেমনি ক্ষমতায় না থাকলে তাদের অবস্থা কী হবে বা হতে পারে তাও তাদের অনুভূত হয় না; যা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সহায়তাদান করার লক্ষ্যে সংবিধান ১২৬ ধারায় আরেকটি অসম্পূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে, যা হলো ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। ’ যেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং প্রধান নির্বাহী কর্তৃপক্ষ সেখানে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনকে কী সহায়তা করবে, তা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের লাখো-কোটি টাকার প্রশ্ন। যেখানে রাজনীতির মূল বিষয় হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, ব্যক্তিগত হিংসা ও আক্রোশ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রিয় বিষয় তোষামোদি সেখানে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়তা করবে তা সোনার পাথর বাটি চাওয়ার মতোই অলীক কামনা! দেশের সচেতন মানুষের প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন কিন্তু তার জন্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে কোনো ধরনের ক্ষমতাই দেওয়া হয়নি, বরং কমিশনকে সরকারের মুখাপেক্ষী করা হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত দায়িত্বসমূহের জন্য যেরূপ কর্মচারীর প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেইরূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন। ’ কিন্তু রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতাবলে কোনো কর্মচারী প্রদানের ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দেয় না। সে ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুষ্ঠু নির্বাচনের তথাকথিত অঙ্গীকার জাতির সামনে প্রহসন ছাড়া কিছু নয় বলে অনেকে মনে করেন।

নির্বাচন কমিশন নামকাওয়াস্তে নির্বাচন পরিচালনা করে। প্রকৃতপক্ষে স্থানীয়ভাবে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ প্রশাসন তথা থানার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ওসি। নির্বাচনে ওসি যার পক্ষে থাকবেন জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তার সবচেয়ে বেশি থাকবে। এমনকি জাতীয় নির্বাচনেও ওসি সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নিয়ন্ত্রক, যাকে নির্বাচনের সময় বাঘা বাঘা জাতীয় নেতারাও তোয়াজ করেন। আমার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো স্থানীয় ওসিকে মোটা অঙ্কের অর্থ না দিলে শত ভালো জনপ্রিয় প্রার্থীরও জয়লাভের সম্ভাবনা কম। নির্বাচন কমিশন যত চেষ্টাই করুক না কেন, ওসির সহযোগিতা ছাড়া কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া দুষ্কর। থানার ওসি বর্তমান শাসনব্যবস্থায় এক দোর্দণ্ড ক্ষমতাশালী দৈত্যে পরিণত হয়েছেন, যাকে শুধু রাষ্ট্র নয়, সরকারের কর্ণধাররাও নাকি তোয়াজ করেন! ওসির পর জাতীয় নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাশালী শক্তি হলেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং মেম্বার যারা মোটামুটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটের আড়তদার। জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। যার ফলে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা প্রকাশ্যেই ভোট বেচাকেনা করেন। জাল ভোটের সিংহভাগ জোগানদাতা এই চেয়ারম্যান-মেম্বাররা। তা ছাড়া প্রিসাইডিং অফিসারের নির্বাচন-পূর্ববর্তী রাতে থাকার জায়গা এবং নির্বাচন কেন্দ্র প্রস্তুত করার দায়িত্বও দেওয়া হয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ওপর। এমনকি প্রিসাইডিং অফিসারসহ পুলিশ, আনসার এবং নির্বাচন তদারককারী সবার আদর-আপ্যায়নের গুরুদায়িত্বটিও তাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এই চেয়ারম্যান-মেম্বারা জনগণের কল্যাণ তথা উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের জন্য খুবই আনচান থাকেন। বাচ্চাদের যেমন লেমনচুষ দিয়ে ঘোরানো যায় তেমনি এই মেম্বার-চেয়ারম্যানদের রিলিফের গম বা উন্নয়নের অর্থের বরাদ্দের নামে যে কোনো কর্ম করানো যায়।

 চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সিংহভাগ কখনই যোগ্য-সৎ প্রার্থীদের ধারেকাছেও থাকেন না, কারণ তাদের ধারণা যোগ্য-সৎ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তারা লুটেপুটে খেতে পারবেন না। এজন্য তারা অসৎ-অযোগ্য প্রার্থীদের তাদের মক্কেল ও আগামী দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মদদ জোগান। এই দুষ্টচক্রের সঙ্গে যোগ দেয় সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র। থানার পুলিশ তথা ওসি, চেয়ারম্যান-মেম্বার এবং সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র— এই তিন চক্রকে সামাল দিতে না পারলে তাদের ইচ্ছার বাইরে কোনো জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা দুরাশার শামিল। নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে আসতে পারবে কিনা তাও নির্ভর করে এই ক্ষমতাশালী চক্রের ওপর। এমনকি কখনো কখনো নির্বাচনের আগের রাতে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ইন্ধনে তাদের হেফাজতে থাকা প্রিসাইডিং অফিসার ব্যালট পেপার ও সিলের সদ্ব্যবহার (!) করার সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে নির্বাচনের মোটামুটি ১০-১৫% ভাগ ভোট কাস্টিং এগিয়ে রাখেন। এই দুষ্টত্রৈয়ী চক্রের দাপটে বিরোধী পক্ষ অনেক সময় ভোট কেন্দ্রের কাছেই আসতে পারে না, নির্বাচনের শুরুতে নিয়ম মোতাবেক ব্যালট বাক্স পরীক্ষা করা তো দিবাস্বপ্ন। আর যদি কোনো পক্ষ জাল ভোট নিয়ে চাপাচাপি করার চেষ্টা করে তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তাদের সন্ত্রাসী ও ভারতের দালাল এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে তাদের জামায়াত বা জঙ্গি বানানোর চেষ্টা করবে এমনটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মহান দায়িত্ব (!) পালনে আপত্তি উত্থাপনকারীরা নির্বাচন বানচাল করতে চান এ অভিযোগ তুলে হয়তো আপত্তিকারীদের তত্ক্ষণাৎ গ্রেফতার করিয়ে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখবে! এ আটক করার কাজটি মহাভাব নিয়ে করবেন অল্প বয়সের কিছু ম্যাজিস্ট্রেট যারা আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে খুবই পায়বন্দ!! মানুষের প্রতিবাদকে বোঝার ক্ষমতা ওই ম্যাজিস্ট্রেটদের নেই তাই শৃঙ্খলা বা শান্তির নামে গোলাগুলি করতেও ওদের বাধে না। নিজেদের অবচেতন মনেই প্রশাসন তথা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ চক্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেন, কারণ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন নির্বাচন শেষ করা তাদের মহান দায়িত্ব। নির্বাচন কীভাবে হয়েছে, ভোটার কেন আসেনি বা নির্বাচন সুষ্ঠু-অসুষ্ঠু দেখার দায়িত্ব তাদের নয় বলে তারা মনে করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোট দিতে আসা ভোটাররা ভোট দেবে, জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে দেখবে ইত্যাদি মহান মহান কাজ তাদের!! যদি কোনো কেন্দ্রে গোলযোগ না হয় তাহলেই দিনের শেষে সুষ্ঠু নির্বাচনের তকমা দিয়ে সাহেবরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বাকবাকুম করতে করতে নিজেদের নিরাপদ নীড়ে ফিরে যাবেন। ভোটার এলো কি এলো না বা কেন এলো না তা দেখার দায়িত্ব ওই কর্মকর্তা বা নির্বাচন কমিশনের নয়! কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্ব নাকি শুধু আইনশৃঙ্খলা দেখা, কেউ যেন নির্বাচন কেন্দ্রে গোলযোগ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। এই হলো আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের হালহকিকত!! সেখানে জনগণ অসহায়। সংবিধান নীরব। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে ১১৯ ধারার (খ) উপধারায় সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব দিয়েছে কিন্তু নির্বাচন কাকে বলে তা সংবিধানের কোথাও সংজ্ঞায়িত করেনি। তাই নির্বাচন আজ প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ, চেয়ারম্যান, মেম্বার, স্থানীয় বা জাতীয় সন্ত্রাসী সাধারণত সব সময় সরকারি দলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এমনকি খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ, এসপি থেকে নিচে এবং ডিসি থেকে নিচে সবাই সরকারি দলের প্রিয়ভাজন বলে মনে করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কোনো পক্ষ নেবেন না বলে জাতির সামনে মুচলেকা দিয়েছেন কিন্তু বাকিরা কী করবেন তা এখনো খোলাসা নয়!

জাতি আজ এক নতুন ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকার যতই ক্ষমতার দাপট দেখাক বা বিরোধী দল নির্বাচনে না আসার কৌশল আঁটুক জাতি কিন্তু আরেকটি ভোটারবিহীন নির্বাচন মেনে নিতে পারবে না। আগামী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সংকট আমাদের কারও কাম্য হতে পারে না। সরকার বর্তমানে যতই শক্তিশালী থাকুক না কেন, নির্বাচনের সময় এ শক্তি থাকবে না, যা খুবই স্বাভাবিক। তাই জনগণকে আস্থায় নিয়ে সব রাজনৈতিক পক্ষকে আলোচনায় বসে জাতির স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। ঘরে আগুন লাগার পরে আগুন নেভানো জরুরি কিন্তু আগুন লাগার সম্ভাবনা থেকে কার্যকর আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ শুধু বুদ্ধিমানের কাজ নয় জীবন এবং সম্পদহানির ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়ার সর্বোত্তম উপায় বলে অনেকে মনে করে। আগুন লাগার সম্ভাবনা নেই এ কথা যেমন ১০০% গ্যারান্টি দিয়ে কেউ বলতে পারবে না তেমনি আগুন লাগবেই এ কথাও কেউ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবে না। অনেকে বলেন যায় দিন ভালো, কিন্তু আসার দিনে ভরসা নেই। মানুষ পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তন আনতে হলে বিরোধী দলকেই এগিয়ে আসতে হবে। পরের অমঙ্গল কামনা করলে নিজের অমঙ্গল আগে হয় এই শ্রুতিবাক্য মনে রেখে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনের দিকে এগোলে ইতিবাচক ফল আশা করা ভুল হবে না। না হলে আবারও ভুলের খেসারত দিতে হতে পারে। আজকের এই সময়ে চরম রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো আজকের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক ক্ষমতা ও পরাক্রমশালী প্রধানমন্ত্রী; যাকে মেনে নেওয়াই হবে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

জনগণের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই সুষ্ঠু নির্বাচনের গ্যারান্টি আদায় করা হবে রাজনৈতিক সফলতা। আগামী নির্বাচন উভয় রাজনৈতিক পক্ষের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। এ লড়াইয়ে উভয়কেই জিততে হবে।

‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে, এই দিনেরে নিয়ে যাবে সেই দিনেরই কাছে’, এই শ্রুতিকথাটি সবার জন্য প্রযোজ্য।

 মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.)

মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.)

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য।

সুত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন ::

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি পরীক্ষার রুটিন

It's only fair to share...21400চকরিয়া নিউজ ডেস্ক :: চলতি বছরের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী ...